রেলওয়ের নতুন মাস্টারপ্ল্যান, প্রাধান্য পেয়েছে চট্টগ্রাম

বিগত দেড়শ’ বছরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবার প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির গরমিলও আছে। তারপরেও বর্তমান সরকারের আমলে রেল অনেকটাই গতিশীল হয়েছে। বেড়েছে যাত্রীসেবার মান। রেলওয়েকে আরো গতিশীল করতে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মাস্টারপ্ল্যানে রেলওয়েকে আন্তর্জাতিক করিডোরে সংযুক্ত করতেও নেয়া আছে বেশ কিছু পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বেশি। এরইমধ্যে সেই অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সারাদেশকে রেলের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও অনেক স্থানে যুক্ত হবে ডাবল লাইন। মিটারগেজ লাইনগুলোকে পরিণত করা হবে ব্রড গেজে।

জানা গেছে, নতুন মাস্টারপ্ল্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রেলের প্রধান করিডোরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম পর্বের প্রকল্পগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেব সংরক্ষণ করতে পুনর্নির্মাণ করা, ২০০টি যাত্রীবাহী বগি ও ৪৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় দ্বিতীয় পর্বে প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেন চলাচলে এক্সপ্রেস রেলপথ নির্মাণ, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, বিদ্যমান লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর এবং চট্টগ্রামে ইন্টার-মোডাল টার্মিনাল নির্মাণ।

আরো পড়ুন: করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে আসা যাত্রীদের ১৫ দিন ট্রেন ভ্রমণ নিষিদ্ধ

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় তৃতীয় পর্বের প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে ফৌজদারহাটে দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ। মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম পর্বের সময়সীমা ২০১৬-২০২০। দ্বিতীয় পর্বের সময়সীমা ২০২১-২০২৫। এবং তৃতীয় পর্বের সময়সীমা ২০২৬-২০৩০।

এছাড়াও ছয় পর্বের মাস্টারপ্ল্যানে ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহন করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, এ মাস্টারপ্ল্যান ছয় পর্বে মোট ২৩৫টি প্রকল্পে বাস্তবায়িত হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। মাস্টারপ্ল্যানটি শুরু হয়েছে ২০১৬ সাল থেকে। শেষ হবে ২০৪৫ সালে।

মাস্টারপ্ল্যানের প্রথম ফেজে (২০১৬-২০২০) নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে ৪৩৮ দশমিক ৫২ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ভাঙ্গা-বরিশাল-পায়রা ২১৩ কিলোমিটার, আখাউড়া-আগরতলা ১০ দশমিক শূন্য এক কিলোমিটার, বগুড়া-জামতৈল ৮৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার, চিলাহাটী-চিলাহাটী বর্ডার সাত কিলোমিটার, জালানীহাট-চুয়েট-কাপ্তাই ৪২ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল সংযোগ রেলপথ ১৬ কিলোমিটার, দর্শনা-মেহেরপুর-মুজিবনগর ২৬ কিলোমিটার, ফেনী-মিরেরসরাই ইকোনমিক জোন সংযোগ ৩০ কিলোমিটার ও জামালপুর ইকোনমিক জোন সংযোগ রেলপথ আট কিলোমিটার।

দ্বিতীয় ফেজে (২০২১-২০২৫) নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে ৫২৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ ২৩০ কিলোমিটার, ঢাকা শহরের চারপাশে বৃত্তাকার রেলপথ ১০০ কিলোমিটার, কুষ্টিয়া বাইপাস রেলপথ ১০ কিলোমিটার, ঈশ্বরদী-ইপিজেড সংযোগ রেলপথ ছয় কিলোমিটার, মহেশখালী ও মাতারবাড়ী সংযোগ রেলপথ ১৮ কিলোমিটার, নাভারণ-সাতক্ষীরা ৮৫ কিলোমিটার রেলপথ, ছাতকবাজার-সুনামগঞ্জ ৩০ কিলোমিটার রেলপথ, সাতক্ষীরা-মুন্সীগঞ্জ ১৫ কিলোমিটার রেলপথ ও জামালপুর-শেরপুর ৩২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ।

তৃতীয় ফেজে (২০২৬-২০৩০) নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে ১৬৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে পায়রা-কুয়াকাটা ২৫ কিলোমিটার, ভৈরব-আবদুলপুর-জামতৈল-কাউনিয়া বাইপাস ২০ কিলোমিটার, টুঙ্গিপাড়া-মোংলা-ফকিরহাট ৭০ কিলোমিটার ও পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা ৭০ কিলোমিটার রেলপথ।

চতুর্থ ফেজে (২০৩১-২০৩৫) নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে ৪৮৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী সাবওয়ে (ভূগর্ভস্থ রেলপথ) ৪০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রেলপথ ১০০ কিলোমিটার, নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি ৬০ কিলোমিটার, হাটহাজারী-রাঙামাটি ৪০ কিলোমিটার, দোহাজারী-বান্দরবান ২৫ কিলোমিটার, পঞ্চগড়-চিলাহাটি-হাতিয়াবান্ধা ৬০ কিলোমিটার, রোহনপুর-জয়পুরহাট ৮০ কিলোমিটার ও যশোর-মাগুরা-শ্রীপুর-লাঙ্গলবান্ধা-পাংশা ৮০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ।

পঞ্চম ফেজে (২০৩৬-২০৪০) নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে ১৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে জয়দেবপুর-ধামরাই-মানিকগঞ্জ-পাটুরিয়া ৯০ কিলোমিটার রেলপথ ও মধুখালী-মাগুরা-যশোর ৬৫ কিলোমিটার রেলপথ। সব মিলিয়ে পাঁচ ফেজে এক হাজার ৭৬৯ দশমিক ৫২ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, পাঁচ ফেজে এক হাজার ৬৩৮ দশমিক ৪১ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ফেজে রূপান্তর করা হবে আখাউড়া-সিলেট ১৭৭ কিলোমিটার, পাবর্তীপুর-কাউনিয়া ৫৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার ও সিলেট-ছাতকবাজার ৩৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটার।

দ্বিতীয় ফেজে টঙ্গী-ভৈরববাজার ১২৮ কিলোমিটার, ভৈরব-আখাউড়া ৬৬ কিলোমিটার ও লাকসাম-চট্টগ্রাম ১৫৯ দশমিক দুই কিলোমিটার ডাবল লাইন রেলপথকে ডুয়েলগেজ করা হবে। এছাড়া শান্তাহার-বগুড়া ৩৯ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর ১৪৭ কিলোমিটার, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ১৬ দশমিক এক কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-ষোলশহর ১২ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার ও ষোলশহর-দোহাজারী ৪০ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে।

তৃতীয় ফেজে ভৈরববাজার-ময়মনসিংহ ১১৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার, লাকসাম-চাঁদপুর ৫১ দশমিক ৫২ কিলোমিটার, লাকসাম-নোয়াখালী ৪৯ দশমিক ১১ কিলোমিটার, ষোলশহর-নাজিরহাট ৩০ দশমিক ছয় কিলোমিটার, ফতেয়াবাদ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দুই দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং বগুড়া-লালমনিরহাট-বোনারপাড়া ও ত্রিমোহনী-বালাশীঘাট ১১৫ দশমিক ২১ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে।

চতুর্থ ফেজে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে জামালপুর-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব ও জামালপুর-বাহাদুরাবাদঘাট ১১৭ দশমিক শূন্য তিন কিলোমিটার, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ ও শ্যামগঞ্জ-জারিয়া ঝাঞ্ঝাইল ৭০ দশমিক ৬১ কিলোমিটার এবং শায়েস্তাগঞ্জ-বাল্লা ২৭ কিলোমিটার রেলপথ।

আর পঞ্চম ফেজে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে লালমনিরহাট-বুড়িমাড়ি ও তিস্তা-রমনাবাজার ৮৪ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার রেলপথ।

রেলপথের পাশাপাশি ছয়টি নতুন ওয়ার্কশপ ও ছয়টি নতুন রেল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ওয়ার্কশপগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ, নায়ারণগঞ্জ ডেমু ওয়ার্কশপ, সৈয়দপুরে নতুন ইউনিট, চট্টগ্রাম লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ, রাজবাড়ী লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ এবং ময়মনসিংহ ক্যারেজ ও ওয়াগন ওয়ার্কশপ।

আর যমুনা রেল সেতু, কর্ণফুলী রেল সেতু, তিস্তা রেল সেতু, হার্ডিঞ্জ রেল সেতু, মৌকুরী-ঢালারচর পয়েন্টে পদ্মা রেল সেতু এবং ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদঘাট রেল সেতু নির্মাণ করা হবে।

রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন জানান, প্রস্তাবিত ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৭৯৮ দশমিক ০৯ কিলোমিটার নতুন রেললাইন এবং বিদ্যমান রেললাইনের সমান্তরালে ৯৭৭ দশমিক ৭০ কিলোমিটার ডাবল রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৮৪৬ দশমিক ৫১ কিলোমিটার রেললাইন পুনর্বাসন, ৯টি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতু নির্মাণ, লেভেল ক্রসিং গেটসহ অন্যান্য অবকাঠামোর মানোন্নয়ন ও আইসিডি নির্মাণ করা হবে।

তিনি জানান, এর আওতায় ওয়ার্কশপ নির্মাণ, ১৬০টি নতুন লোকোমোটিভ, ১৭০৪টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ইক্যুইপমেন্টস সংগ্রহ, ২২২টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার মানোন্নয়ন করা হবে। এছাড়া হালনাগাদকৃত মাস্টারপ্ল্যানে ৬টি পর্যায়ে (২০১৬-২০৪৫) বাস্তবায়নের জন্য ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত আছে, যা বাস্তবায়িত হলে মোট প্রায় ২৭১৫ দশমিক ৫৮ কিমি নতুন রেলপথ নির্মিত হবে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

চস/আজহার

শেয়ার করুন

The Post Viewed By: 112 People

Chattogram Somoy

চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত চট্টগ্রাম সময় একটি আধুনিক নিউজ পোর্টাল। ২৪ ঘন্টা খবরের সন্ধানে ছুটে চলা একদল সংবাদদাতা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৯ এর জুলাইয়ে। কোনো একটা নির্দিষ্ট দিক নয়, চট্টগ্রাম সময় কাজ করছে প্রতিটা দিক নিয়ে। আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলায় আপনাদের সাথী হিসেবে পেতে চাই।