টিকা ট্রায়ালের অনুমতিতে আরও একধাপ আগালো বাংলাদেশ

করোনা মহামারীতে ভুগছে পুরো বিশ্ব। দিনকে দিন বাড়ছে করোনার বিস্তৃতি। তবে একইসঙ্গে চলছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস দমনের টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা। কারণ ভ্যাকসিন বা টিকা-কেই করোনাভাইরাস মোকাবেলায় একমাত্র ভরসাস্থল বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা টিকা বানাতে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির তৃতীয় ধাপে মানবদেহে পরীক্ষা বা ট্রায়াল চলছে। মানবদেহে পরীক্ষা চলমান টিকার মধ্যে একটি হলো চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেডের তৈরি ভ্যাকসিন। যে টিকা বা ভ্যাকসিনের মানব দেহে ট্রায়াল চালাতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।

ব্রাজিল, ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশের হয়ে মানবদেহে ভ্যাকসিনের পরীক্ষা চালানোর জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছে। সেই তালিকায় এখন যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনার পর সম্প্রতি চীনের সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়াতে বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সুযোগ বাড়লো বলে ধারণা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। কারণ বাংলাদেশে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হলে প্রথমত টিকার সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে বাংলাদেশে। আর এই টিকা সফল প্রমাণিত হলে সর্বাগ্রে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে বাংলাদেশের।

বাংলাদেশের জন্য করোনা টিকা কতটা জরুরি
বিশ্ব ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে যে, করোনা মোকাবেলার একমাত্র পথ একটি কার্যকর টিকা বা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন। গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ করোনাতে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন আর মারা গেছে ৪ সহস্রাধিক। প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন মানুষ করোনাতে মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু হার প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে৷ সামনে আসছে শীতকাল এবং আছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশংকা। কাজেই বাংলাদেশের জন্য করোনা টিকা কতটা জরুরি সেটা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পুরোপুরি লকডাউন কার্যকর করা সম্ভব নয়। জীবিকার তাগিদে মানুষকে ঘরের বাইরে বের হতেই হয়। বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “বাংলাদেশের জন্য একটি ভ্যাকসিন খুবই দরকার কারণ বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এত দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সবকিছু বন্ধ রেখে মানুষকে ঘরে রাখা খুবই সমস্যার একটি বিষয়। কারণ জীবন টিকিয়ে রাখতে হলে জীবিকাও লাগবে।” কাজেই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলাদেশের জন্য করোনা টিকার কোনো বিকল্প নাই।

করোনা টিকা আবিষ্কারের পর কীভাবে পেতে পারে বাংলাদেশ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিন প্রক্রিয়ায় টিকা বা ভ্যাকসিন পাওয়া যেতে পারে। প্রথম পথ হলো নিজেদের তৈরি করা ভ্যাকসিন। দ্বিতীয়ত অন্যদের তৈরি ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করা এবং তৃতীয়টি হলো অন্য দেশের তৈরি করা টিকা কিনে নেয়া কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে চুক্তি করে নেয়া, যেমন আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোট ‘গ্যাভি’র মাধ্যমে।

টিকা বা ভ্যাকসিন পাবার প্রথম পদ্ধতি অর্থাৎ দেশে একটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যদিও বাংলাদেশে করোনার সম্ভাব্য টিকা উদ্ভাবনের প্রক্রিয়ায় দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড আছে বলে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিল ২রা জুলাই। সেই সংবাদ সম্মেলনের পর এখন পর্যন্ত গ্লোব বায়োটেক উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের অগ্রগতি সম্পর্কে আর তেমন কিছু জানা যায়নি।

আর তাই বলা যায়, বাংলাদেশের করোনা ভ্যাকসিন পাবার পথ হলো অন্য দেশের তৈরিকৃত ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশগ্রহণ কিংবা অন্য দেশের তৈরি ভ্যাকসিন যেকোনো উপায়ে সংগ্রহ করা। করোনা টিকা সংগ্রহে এ দুটি পথেই হাটছে বাংলাদেশ।

উন্নত দেশগুলো করোনা টিকা আবিষ্কার হলে সেটা আবিষ্কারকদের কাছ থেকে কিনে নিবে। যেমন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির টিকার জন্য এরই মধ্যে এক কোটির চাহিদা দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। চাহিদার কথা জানিয়েছে ব্রাজিলও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এর নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ডলারের বেশি, তাদের টিকা কিনতে হবে। টিকা কেনার দৌড়ে নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে আছে ক্ষমতাধর দেশগুলো। উদাহরণস্বরূপ ডিসেম্বরের মধ্যে ১০ কোটি ডোজ করোনা টিকা পেতে টিকা উৎপাদনকারী ফাইজার ও বায়ো এন টেকের সঙ্গে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় যেহেতু ৪ হাজার ডলারের কম, ফলে বাংলাদেশ বিনামূল্যে টিকা পাবার কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন)‘র (টিকা বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট) টিকার অগ্রাধিকার পাওয়া ৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এসব সংস্থা নিজেদের অর্থে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করে।

সাধারণত কোনো একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ২০ ভাগের জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহ করে ডব্লিউএইচও এবং গ্যাভি। এই হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরা হলে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া ভ্যাকসিন দেয়া যাবে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষকে। বাকি ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জন্য ভ্যাকসিন কিনে আনতে হবে।

এদিকে গ্যাভি স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে করোনা ভ্যাকসিন বিনা মূল্যে দেবে, নাকি ভ্যাকসিন উৎপাদন খরচের কিছুটা নেওয়া হবে সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, সিদ্ধান্ত নিতে সেপ্টেম্বর মাসে বোর্ড মিটিংয়ে বসবে গ্যাভি। তবে গ্যাভি সাধারণত বিনামূল্যেই ভ্যাকসিন সরবরাহ করে থাকে। গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে “ভ্যাকসিন হিরো” পুরস্কারে ভূষিত করে। কাজেই গ্যাভি’র সরবরাহকৃত করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশ সহজে পাবে বলে আশা করাই যায়।

এদিকে গত ১১ আগস্ট কোভিড-১৯ এর টিকা আবিষ্কার করেছে বলে সবার আগে ঘোষণা দেয় রাশিয়া। দেশটির ঘোষণা অনুযায়ী বহুল প্রতিক্ষীত প্রথম প্রতিষেধক স্পুটনিক-৫ একশ ভাগ নিরাপদ এবং তা শিগগিরই বাজারে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে, তাই আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ টিকা পেতে পারি বলে আশাবাদ অনেকের।

প্রতিবেশী দেশ ভারত অক্সফোর্ডের টিকা উৎপাদনে যুক্ত থাকায় তা সংগ্রহ করা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে বলেও ধারণা অনেকের। দ্বিতীয় ধাপ থেকেই কোভিশিল্ড নামের ওই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে যাচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউটি অফ ইন্ডিয়া (এসআইই)। সুখের কথা হলো গত ২৮ আগস্ট তারিখে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটি অফ ইন্ডিয়া (এসআইই)র সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যাল৷ চুক্তি অনুযায়ী সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ করবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। ভ্যাকসিন পাবার বিভিন্ন উদ্যোগের মাঝে নতুন আশাবাদ জাগাল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

আরো পড়ুন: কাদের: যেকোনো সময় প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে করোনা

ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে এই বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমান উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন ডয়েচে ভেলেকে বলেন, ভ্যাকসিন পেতে সরকার সব পথই খোলা রেখেছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল যারাই দিতে চাচ্ছে তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। এগুলোর কোনটি যদি সফল হয় তাহলে তো খুবই ভালো। বিশেষ করে বিনা পয়সায় বা কম মূল্যে যদি পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে হবে।’

সরকার ভ্যাকসিন আবিস্কারের পথে এগিয়ে থাকা সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে বলে দাবি করে ডা. মুশতাক আরো বলেন, দ্বিপাক্ষিকভাবেও সরকার চেষ্টা করছে। যেমন রাশিয়ার ভ্যাকসিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে নেই৷ কিন্তু তাদের ভ্যাকসিন পেতেও সরকার যোগাযোগ রাখছে বলে জানান তিনি।

জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম। ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশটির সব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পথচলা সুগম করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে করোনা টিকার কোনো বিকল্প নাই। বহুল আকাঙ্খিত সেই করোনা টিকা পেতে বাংলাদেশ বিদেশী বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণ কিংবা প্রয়োজনে টাকা খরচ করে টিকা কিনে আনার প্রক্রিয়ায় সব সময় এগিয়ে থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

লেখক: মু. মাহবুবুর রহমান, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

**বণিকবার্তার সৌজন্যে

শেয়ার করুন

The Post Viewed By: 49 People

Chattogram Somoy

চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত চট্টগ্রাম সময় একটি আধুনিক নিউজ পোর্টাল। ২৪ ঘন্টা খবরের সন্ধানে ছুটে চলা একদল সংবাদদাতা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৯ এর জুলাইয়ে। কোনো একটা নির্দিষ্ট দিক নয়, চট্টগ্রাম সময় কাজ করছে প্রতিটা দিক নিয়ে। আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলায় আপনাদের সাথী হিসেবে পেতে চাই।

২ thoughts on “টিকা ট্রায়ালের অনুমতিতে আরও একধাপ আগালো বাংলাদেশ

Comments are closed.