খোলামেলা অনুভূতি বইয়ের সেরা চার রিভিউ

58
বই
ads here
শেষ হলো খোলামেলা অনুভূতি বইয়ের রিভিউ প্রতিযোগিতা। একনজরে পেড়ে নেওয়া যাক সেরা চার রিভিউ।

সাহসী কথার প্রতিধ্বনী- খোলামেলা অনুভূতি
মনিরা মিতা

ads here

প্রবন্ধ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রকৃষ্ট রূপে বন্ধন । ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন’বিষয়বস্তু ও চিন্তার ধারাবাহিক বন্ধনকে বোঝায় । নাতিদীর্ঘ, সুবিন্যস্ত গদ্য রচনাকে প্রবন্ধ বলে । প্রবন্ধ রচনার বিষয়, ভাব, ভাষা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ।
এক কথায় কল্পনা শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে লেখক যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য রূপ সৃষ্টি করেন তাই প্রবন্ধ । প্রবন্ধও সাহিত্য রূপ, প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

পড়া শেষ করলাম ‘আজহার মাহমুদ’ রচিত ‘খোলামেলা অনুভূতি’ প্রবন্ধগ্রন্থটি। ‘আজহার মাহমুদ’ বাংলা সাহিত্যে নতুন নাম কিন্তু তার বইটি পড়তে গিয়ে ক্লান্তবোধ করিনি। গ্রন্থটিতে ২৭টি প্রবন্ধ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো প্রতিটি প্রবন্ধই দৈনিক পত্রিকায় এক বা একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো আকারে ছোট হলেও বেশ তথ্য নির্ভর।

প্রথম প্রবন্ধের নাম -“আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে শব্দ সন্ত্রাস ”
শব্দ দূষণকে সন্ত্রাস নামে অভিহিত করা হয়েছে প্রবন্ধে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে যে কোন শহরে শব্দের মাত্রা দিনে সর্বোচ্চ ৪৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৩৫ ডেসিবেল। শয়নকক্ষের জন্য আলাদা পরিমাণ রয়েছে। সেটি ২৫ ডেসিবেলের উপর অনুমোদিত নয়। অফিস-আদালতে ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবেল। মানুষের শ্রবণযোগ্য শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল হলেও বর্তমানে আমরা ৬০-৭০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা সহ্য করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতে, ৭৫ ডেসিবেল কিংবা তার বেশি মাত্রার শব্দ দূষণ হলে মানুষ ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। টাইলস বসানো, ইট ভাঙার মেশিন, মাইকিং, উচ্চস্বরে গান – বাজনা ইত্যাদি কারনে প্রতিনিয়ত শব্দ দূষণ হচ্ছে। শব্দ দূষণে শিশু- কিশোরদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এছাড়াও উচ্চ শব্দ হলে হার্টের বিট বেড়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১% মানুষ ইতিমধ্যে শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে শব্দ দূষণের কারনে।

২য় প্রবন্ধটি ‘একুশ বাঙালির গর্ব এবং অহংকার ‘
রক্ত দিয়ে ভাষা কিনেছি আমরা। ভাষা আন্দোলন বাঙালির গর্ব। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারিকে অান্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
কিন্তু আফসোস আমরা বাংলা ভাষাকে ভুলে
যাচ্ছি। রফিক, সালাম,জব্বারের আত্মদানের মর্যাদা আমরা দিচ্ছি না।
পরবর্তী প্রবন্ধ ‘ কালের কলস থমকে গেলো’। কবি আল মাহমুদ কে নিয়ে চমৎকার এই প্রবন্ধটি তথ্যপূর্ণ। কবির প্রথম কবিতা প্রকাশ পায় ১৮ বছর বয়সে। তিনি সমকাল পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
লোকান্তর, কালের কলস, সোনালি কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে উঠো তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এই কবি।(১৯৭২- ১৯৭৪) তিনি দৈনিক
গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এ সময় তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে লেখার জন্য তাকে ১ বছর কারাগারে থাকতে হয়েছিল।
১৯৬৮ সালে “লোক লোকান্তর” ও “কালের কলস” নামে দুটি গ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তার ঝুলিতে রয়েছে নানা পুরস্কার।
কবি আল মাহমুদ ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
পরবর্তী প্রবন্ধ ‘ আমাদের সবচে’ বড় শক্তি স্বাধীনতা’
প্রবন্ধকার এই প্রবন্ধে বোঝাতে চেয়েছেন আমরা নানাভাবে পরাধীন। কখনো নিজ পরিবারের কাছে, কখনো সমাজের কাছে, কখনো প্রশাসনের কাছে আবার কখনো প্রেমিক/ প্রেমিকার কাছে।
আমরা চাইলেই নিজেকে স্বাধীন করতে পারছি না।
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত ঝরিয়ে স্বাধীন হলেও বন্ধ হয়নি সীমান্তে মানুষ হত্যা। বঙ্গবন্ধু জাতিকে আলো দেখিয়েছিলেন, ৭ মার্চের ভাষণ সবাইকে এক প্লাটফর্মে দাঁড় করায় এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় আসে।
স্বাধীন দেশে সকলের একই চাওয়া- স্বাধীনতা। জয় হোক স্বাধীনতার, জয় হোক বাংলার।
এই প্রবন্ধের শুরু এবং শেষ দুই অংশের ভেতর বিস্তার পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে বলতে বলতে হুট করে ১৯৭১ সালে চলে গিয়ে ঐ প্রসঙ্গের বর্ণনা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

পরবর্তী প্রবন্ধ- ‘ বই হোক জীবনের সঙ্গী’
এখানে প্রবন্ধকার বইকে সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু বলেছেন।বইয়ের ভেতর রয়েছে সবধরণের জ্ঞান। এই প্রবন্ধের দুটি বাক্য মনে দাগ কেটেছে –
১৷ ‘জ্ঞান চর্চা মানুষকে যেমন মহৎ করে তোলে, তেমনি চিত্তকে মুক্তি দেয়।’
২।’ বই মানুষের মননশীলতার সম্প্রসারণ ও জ্ঞানের গভীরতা বাড়ায়।’
এই প্রবন্ধে প্রবন্ধকার আফসোস করে বলেছেন এখন তরুণরা বই পড়ে না। তিনি আরও বলেছেন কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে, সে দৈনিক পত্রিকা পুরোটা পড়ে।
এই জায়গায় আমি প্রবন্ধকারের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। কারন প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা পুরোটা পড়ার সময় বা ধৈর্য্য কারো থাকে না। ব্যস্ত জীবনে এতোটা সময় কারো নেই। উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠ করাটাই মূখ্য।
ভালো লেগেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য পুরস্কার বাদ দিয়ে বই প্রদান করার পরামর্শ। এতে বইয়ের প্রতি ছাত্র- ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়বে।

পরবর্তী প্রবন্ধের নাম ‘ বদলে যাওয়া চট্টগ্রাম ‘
এই প্রবন্ধে চট্টগ্রাম নিয়ে চমৎকার তথ্য দিয়েছেন প্রবন্ধকার। চট্টগ্রামের অনেক উন্নয়নের কথা বলেছেন, যেমন- শাহ আমানত সেতু, আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার, জাম্বুরী পার্ক, মিরসরাই ইকোনমিক জোন, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, ইত্যাদি।বর্তমান সরকারের এসব উন্নায়নমূলক কাজের প্রশংসা করেছেন তিনি।

‘ হালদার কান্না শুনবে কে?’ এই প্রবন্ধে হালদার নদীর বেহাল দশার কথা তুলে ধরেছেন প্রাবন্ধকার। তিনি বলেছেন হালদা শুধু একটি নদীর নাম নয় একটি রূপালি সম্পদের খনি। কিন্তু বর্তমানে লোভী দুর্বৃত্ত,ভূমিদস্যু, মৎস্য শিকারীরা হামলে পড়েছে হালদার উপর। ফলে হালদা আজ মৃত্যুর মুখে। নদীতে বর্জ্য ফেলা, রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা, যান্ত্রিক যান ইত্যাদির কারনে নদীর পানি বিষে পরিনত হচ্ছে।
পরিশেষে নদী বাঁচাও দেশ বাঁচাও স্লোগান নিয়ে সকলে হাতে হাত রেখে নদী বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

‘বাবার প্রতি ভালোবাসা’ পরবর্তী প্রবন্ধ।
এই প্রবন্ধে প্রবন্ধকার বলেছেন সন্তানেরা মায়ের প্রতি যতটুকু ভালোবাসা দেখায় বাবার প্রতি ততটুকু দেখায় না। বাবা পরিবারের জন্য আয় করতে বাড়ির বাইরে থাকেন বিধায় আমরা বাবার প্রতি খুব একটা টান অনুভব করি না। অথচ বাবা তার সারাজীবন সন্তানদের কল্যাণে ব্যায় করেন। সন্তানের খুশির চেয়ে বড় তার কাছে আর কিছুই নেই। প্রবন্ধকার বলেছেন, মা দিবসকে আমরা যেভাবে তুলে ধরি, বাবা দিবসকে সেভাবে পালন করি না।
এই জাগায় আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো- মা- বাবাকে ভালোবাসতে কোন দিবস লাগে না। সন্তান হিসাবে বাবা- মা উভয়কে শ্রদ্ধা করা ও ভালোবাসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বাবা যেমন সন্তানের জন্য নিজের সুখ বির্সজন দেয় তেমনি সন্তানেরও উচিত বৃদ্ধ বয়সে বাবার নিরাপত্তার লাঠি হওয়া। তবে মায়ের সাথে সন্তানের সখ্যতা বেশি আছে এবং থাকবে। হাদিস শরিফেও বাবার চেয়ে মায়ের অধিকার তিনগুণ বলা হয়েছে।

‘ শিশুর প্রতি পাশবিকতা, কোন সমাজে বসবাস করছি?’
প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে নিজের ভেতরেই দুমড়ে- মুচড়ে গিয়েছি। সত্যিই তো কোন সমাজে বসবাস করছি আমরা! প্রবন্ধকার এই প্রবন্ধে শিশুদের প্রতি পাশবিক নির্যাতনের নানা চিত্র ও রিপোর্ট তুলে ধরেছেন। এবং এসবের জন্য ধর্মের প্রতি অনাস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, ইত্যাদিকে দায়ী করেছেন। সর্বশেষ এসব তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

পরবর্তী প্রবন্ধ ‘ সড়ক কবে নিরাপদ হবে?’
সড়কে চলছে মৃত্যুর মিছিল। ২০১৮ সালে ছাত্রারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে কিন্তু তবুও কি এসেছে নিরাপদ সড়ক!!
অকালে সড়কে প্রাণ হারানো আবরার, রাজিব, রনি নামগুলো খুব সহজেই আমরা ভুলে যাই।
যানবহন সেক্টরে চলছে দুর্নীতির মহা উৎসব। টাকার বিনিময় অদক্ষ ড্রাইভারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্স, বাড়ছে লাশের বহর। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।
‘ছাত্র রাজনীতি ও নির্বাচন’ এই প্রবন্ধে অনেকটা আফসোস নিয়ে প্রবন্ধকার বলেছেন – ‘চুরি, মারামারি আর দুর্নীতি শেখার নাম ছাত্র রাজনীতি।’
২৮ বছর পর ‘ডাকসু’ নির্বাচন এবং সে নির্বাচন নাটক, সিনেমাকে হার মানিয়েছে বলেও তিনি বলেছেন।
‘রোম যখন পুড়ছিল, নিরু তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’। এই বাক্যের মাধ্যমে আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় অতি উৎসাহী জনতাকে (যারা আগুনের ছবি তুলে ফেসবুকে দেয়, ভিডিও করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কাজে বিঘ্ন ঘটায়) কটাক্ষ করেছেন ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে সকলের ভূমিকা প্রয়োজন’ প্রবন্ধে।
আগুনে পোড়া মানুষ জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বলছে বাঁচাও বাঁচাও অথচ আমরা ওদের বাঁচাতে পারছি না, এরচেয়ে কষ্টের আর কি আছে?

‘ কারিগরি শিক্ষা হোক দুর্নীতি মুক্ত’ এই প্রবন্ধে কারিগরি ট্রেনিং সেক্টরের মারাত্মক দুর্নীতির কথা তুলে ধরেছেন। দেশের মানুষের আস্থা এবং ভরসার নাম ছিলো কারিগরি শিক্ষা, কিন্তু এই শিক্ষাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে কতিপয় অর্থলোভী ব্যক্তি। ছাত্রদের অনুদানের টাকা কর্মকর্তারা ভাগ- বাটোয়ারা করে নিজ পকেট ভারী করে অথচ ছাত্রদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণের পরির্বতে কাগজে কলমে দায়সারা প্রশিক্ষণ দেয়।
‘কলড্রপ ও চাঁদাবাজ একই সূত্রে গাঁথা’ এই প্রবন্ধে প্রবন্ধকার বলেছেন গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেও হচ্ছে না নেটওয়ার্ক উন্নায়ন,হালনাগাদ সুতরাং কলড্রপ হচ্ছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ জনগণ। ডিজিটাল বাংলাদেশে এই অত্যাচার মেনে নেওয়া যায় না বলেও প্রবন্ধকার জানিয়েছেন।
‘ অপসংস্কৃতিই এখন আমাদের সংস্কৃতি’ এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে ইউটিউব, ফেসবুকের নোংরা এবং অসামাজিক বিষয় থেকে এখন বিনোদন নিচ্ছি আমরা। মঞ্চ নাটক, লোকগান, রবীন্দ্র সঙ্গীত সহ সুস্থ সংস্কৃতি আমরা মুছে ফেলেছি জীবন থেকে। দেশীয় সংস্কৃতির চেয়ে বিদেশী সংস্কৃতি এখন বেশি প্রিয়। অপসংস্কৃতির ছোবলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম।

‘চাই বাঁধাহীন আনন্দ’ এই প্রবন্ধে নববর্ষে মন খুলে আনন্দ করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবন্ধকার। সন্ধ্যার আগেই বর্ষবরণ শেষ করে কেন ঘরে ফিরতে হবে এই প্রশ্ন করেছেন।
প্রবন্ধকার বলেছেন-‘আমরা যদি ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীকে নির্মূল করতে পারি তবে আজ কেন ঐতিহ্য এবং আনন্দের দিনে আমরা ভয় পাব।’
পহেলা বৈশাখ আমাদের গৌরব তাই চাই উৎসবে বাধা নয়, চাই অবাধ পরিপূর্ণ আনন্দ। তিনি আরও বলেছেন তাহলে প্রশাসন কি নিরাপত্তা দিতে অক্ষম?
এইখানে প্রবন্ধকারের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। বর্ষবরণে আনন্দ করার নামে মেয়েদের লাঞ্ছিত করার ঘটনা এদেশে কম ঘটেনি। শত নিরাপত্তা সত্ত্বেও আমাদের পশু প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এক সময় প্রশাসন বাধ্য হয়েছে সময় বেঁধে দিতে।
আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছি বাইরের দেশের মানুষের সাথে তাই তাদের পরাজিত করতে পেরেছি কিন্তু আজ ঘরের শত্রু বিভীষণ। ‘৭১ সাথে মা- বোনদের সম্ভ্রম নিয়েছিল শত্রুরা আজও উৎসবের নামে রাত- বিরাত বেহায়াপনা করে মা- বোনদের অসম্মান করছে এদেশীয় পশুগুলো। সুতরাং প্রশাসন নিরাপত্তা দেওয়ার স্বার্থেই সময় বেঁধে দিয়েছে এবং এটি যথাযথ বলে মনে আমি করি।
‘মেধা নয় টাকাই শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি’ এই প্রবন্ধে প্রবন্ধকার বলেছেন- ‘আজ আমাদের দেশের কিছুতেই মেধা দিয়ে বিচার হয় না, বিচার করা হয় টাকা দিয়ে। যার টাকা আছে তার কাছে মেধাও আছে।”মেধাতে নয়, টাকাই এখন শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি’।
প্রবন্ধকার বলেছেন- মেধার প্রয়োজন হলে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হতো, পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধ হতো, বন্ধ হতো টাকার মাধ্যমে মেধা বেচাকেনা।
তিনি আরও বলেছেন- আজকাল মেধার মাধ্যমে ভালো চাকরিও জোটে না মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের। কারন ভালো চাকরির জন্য প্রয়োজন টাকা।
প্রকৃত অর্থে প্রশ্নফাঁস, জালিয়াতির বিষয়গুলো মারাত্মক আকারে বেড়েছে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই৷ কিন্তু ‘মেধা নয় টাকাই এখন শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি’ কথাটার সাথে একমত হতে পারছি না। হ্যাঁ, ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে এটাও ঠিক কিন্তু মেধার মূল্য আগেও ছিল, আছে আর থাকবে। মেধাবীরা কখনো পিছিয়ে থাকে না, ঠিকই মেধার জোরে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়। হয়ত সাময়িক বাঁধা আসে কিন্তু তা ডিঙ্গিয়ে সামনে পা বাড়ায়।
টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনে ভালো জায়গায় চান্স পাওয়া -এটা বিছিন্ন ঘটনা। আজও ঢাবি,খুবি,চাবি, মেডিকেল, বুয়েট,কুয়েটের মত ভালোভাবে প্রতিষ্ঠানে ৯৫% ছাত্র-ছাত্রী মেধার যোগ্যতায় চান্স পায়। তাই ঢালাও ভাবে দোষারোপ করা অনুচিত।

পুরো প্রবন্ধগ্রন্থটি মনযোগ সহকারে পড়ে মনে হয়েছে কিছু বিষয়ে গতানুগতিক লেখার বাইরে আসতে পারেন নাই প্রবন্ধকার। উদাহরণ হিসাবে বলবো – ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ’ প্রবন্ধের কথা। পহেলা বৈশাখেক উৎপত্তি, হালখাতা,বৈশাখী মেলা এগুলো নিয়ে আলোচনা বহুবার নানাভাবে পড়েছি। নতুন তথ্য পাঠককে আকৃষ্ট করে।

প্রবন্ধ কিন্তু সাহিত্যের অংশ, প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সাহিত্যের রূপ,রং, অনুভূতি ঢেলে দিতে বাঁধা নেই। শুধু খটখটে তথ্য দিয়ে প্রবন্ধ রচনা না করে সাহিত্যের মিষ্টিতাও মিশিয়ে প্রবন্ধ রচনা করা যায়। প্রবন্ধকারকে অনুরোধ করবো বিষয়টি বিবেচনা করতে।

বইটিতে প্রায় একই রকম তথ্য ভিত্তিক প্রবন্ধ রয়েছে বেশকিছু। অনেক অংশে যা তথ্যের ও মূল বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হয়েছে সুতরাং এ বিষয়ে প্রবন্ধকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বইটির নাম ‘খোলামেলা অনুভূতি’। নামটা শুনলেই রোমান্টিক কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে অথচ বইটি সিরিয়াস তথ্য নির্ভর বই। এছাড়াও ‘অনুভূতি’ শব্দটার সাথে ‘খোলামেলা’ শব্দটা খুব যৌক্তিক মনে হয়নি। প্রবন্ধকারকে বইয়ের নাম নিয়ে আরেকবার চিন্তা করার অনুরোধ করছি।

প্রিয় বাক্য- ১। একটি জাতি যখন তার নিজ সংস্কৃতিতে বলিষ্ঠ হয় তখন তাকে কোন অপসংস্কৃতি, কু- সংস্কার গ্রাস করতে পারে না।
২। জ্ঞান চর্চা মানুষকে যেমন মহৎপ্রাণ করে তোলে, তেমনি চিত্তকে মুক্তি দেয়। মানবাত্মাকে জীবনবোধে বিকশিত করে।
সর্বপরি ‘আজহার মাহমুদকে’ ধন্যবাদ জানাতে চাই ‘খোলামেলা অনুভূতি’ বইটি প্রকাশ করার জন্য। তথ্য নির্ভর বইটি নতুন প্রজন্মের কাছে বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরবে। ভবিষ্যতে প্রবন্ধকারের নিকট আরও ভালো ভালো বইয়ের প্রত্যাশা করলো।

লেখক: গল্পকার, খুলনা

 

সময়ের সমীকরণ: খোলামেলা অনুভূতি
গোলাম মোর্তুজা

উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ‘প্রবন্ধ’ শব্দটির ব্যবহার হয়। ‘প্রবন্ধ’ প্রকৃতি ও প্রত্যয়জাত একটি তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ। যুক্তিসিদ্ধ এক বিশেষ ধরনের গদ্য রচনাকে প্রবন্ধ বলে। প্রবন্ধকে বস্তুনিষ্ঠ ও ব্যক্তিনিষ্ঠ এই দু শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যে প্রবন্ধগুলো হবে তথ্য-তত্ত¡, যুক্তি-বিচার-বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ সেগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলাই যুক্তিযুক্ত। আর যেগুলো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুভব ও অনুভূতি প্রকাশ পায় সেগুলোকে ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধ বলাই শ্রেয়।

তরুণ প্রাবন্ধিক আজহার মাহমুদ এর ‘খোলামেলা অনুভূতি’ একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ। এই গ্রন্থটিতে মোট ২৭টি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো বিভাজনের ভিত্তিতে দু ভাগেই ভাগ করা যায়। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধগুলো হলে (১) আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ সন্ত্রাস’ (২) ‘একুশ’ বাঙালির গর্ব এবং অহংকার (৩) আমাদের সবচে’ বড় শক্তি স্বাধীনতা (৪) হালদার কান্না শুনবে কে? (৫) সড়ক কবে নিরাপদ হবে? (৬) ছাত্র রাজনীতি এবং নির্বাচন (৭) কারিগরি শিক্ষা হোক দুর্নীতি মুক্ত (৮) কলড্রপ আর চাঁদাবাজ একই সূত্রে গাঁথা (৯) বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণ বাড়াচ্ছে (১০) গণপরিবহনের যত অনিয়ম (১১) অপসংস্কৃতিই এখন আমাদের সংস্কৃতি (১২) ‘মার্চ’ বাঙালির গৌরবের মাস (১৩) পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ। ব্যক্তিনিষ্ঠ প্রবন্ধগুলো হলো (১) কালের কলস থমকে গেল (২) বই হোক জীবনের সঙ্গী (৩) বদলে যাওয়া চট্টগ্রাম (৪) বাবার প্রতি ভালোবাসা (৫) শিশুর প্রতি পাশবিকতা, কোন সমাজে বসবাস করছি? (৬) আগুন নিয়ন্ত্রণে সকলের ভূমিকা প্রয়োজন (৭) “জুয়া” একটি জীবন নষ্টের হাতিয়ার (৮)দান করুন গোপনে (৯) এ প্রজন্ম বিজয় দিবসে গর্বিত (১০) ঘুষ ছাড়া মিলে না চাকরি (১১) বর্ষা মানে কী দুর্ভোগ (১২) ধর্মকে আঘাত করা অবাঞ্চনীয় (১৩) চাই বাধাহীন আনন্দ (১৪) মেধা নয় টাকাই যেনো শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি।

গ্রন্থটির প্রথম প্রবন্ধ ‘আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ সন্ত্রাস’ এখানে শব্দ দূষণের ফলে আমাদের যে কত কী হারিয়ে যাচ্ছে তার একটি প্রামাণ্য চিত্র তুলে ধরেছেন। শব্দ দূষণকে ‘সন্ত্রাস’ এর সাথে তুলনা করা এক অভিনবত্বেরই আচ্ছাদন।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘একুশ’ বাঙালির গর্ব এবং অহংকার’- এখানে প্রাবন্ধিক গৌরবের একুশ নিয়ে বললেও আফসোসও করেছেন,‘আমাদের ভাষা হয়ে গেছে আজ বাংলিশ।’ এখান হতে উত্তোরণের পথ খোঁজা বলেই জরুরি।
তৃতীয় প্রবন্ধ ‘কালের কলস থমকে গেলো’ এই প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক এক নির্নিমিখ ভাবনায় আপ্লুত হয়ে কবি আল মাহমুদ ও নিজের নাম নিয়ে হালকা রসিকতা করেই আবার পরক্ষণেই স্মৃতির পসরা মেলে ধরেছেন।‘যার লেখা কবিতা পড়ে ছোট বেলায় ঘুম পাড়িয়ে দিতো মা। আজ সেই মানুষটিকে চোখের সামনে চলে যেতে দেখে কতটা কষ্ট অনুভব হচ্ছে সেটা বলে বুঝানো যাবে না।’ প্রাবন্ধিক নিজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়েই যেন তা সাধারণের মাঝেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে-এখানেই লেখকের সার্থকতা।

চতুর্থ প্রবন্ধ ‘আমাদের সবচে’ বড় শক্তি স্বাধীনতা’। এই প্রবন্ধ যেন শুধু প্রবন্ধ নয়, এই প্রবন্ধটি যেন সমগ্র বাংলাদেশের মানচিত্রের এক আলপনা। আমাদের প্রাণের স্বাধীনতা। মা হারা বোন হারা, বাবা হারা, মা হারা স্বাধীনতা। প্রাবন্ধিক বলেন, ‘প্রকৃতিপক্ষে স্বাধীন আমরা নই। স্বাধীন শুধু আমাদের দেশ।’ প্রাবন্ধিকের এমন কথার মাঝে আছে এক বাস্তবতার প্রতি আক্ষেপ আর দেশের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা, মায়া। প্রবন্ধের এক জায়গায় প্রাবন্ধিক ‘স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা কঠিন’ কোনো এক মনীষীর বাক্যটি প্রবন্ধে উদ্ধৃতি করে প্রবন্ধটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে বলেই মনে হয়। প্রাবন্ধিকের ‘স্বাধীনতাই পারে প্রকৃত স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে’ কথাটি ভাবিয়ে তোলে।

পঞ্চম প্রবন্ধ ‘বই হোক জীবনের সঙ্গী’-এখানে প্রবন্ধিক সম্পর্কে একটা আলাদা ধারণা জন্মাবে। এখানে তিনি ‘জীবনের জন্য বই প্রয়োজন’ কথাটির মাঝে সমস্ত প্রবন্ধের সারগর্ভ অত্যন্ত সচেতন হয়ে প্রকাশ করেছেন।
ষষ্ঠ প্রবন্ধ ‘বদলে যাওয়া চট্টগ্রাম’-এটি একটি শুধু প্রবন্ধই নয়, এটা যেন প্রাবন্ধিকের প্রাণের উচ্ছ¡াসের শহর। এই শহরে প্রতিটি অলিগলি তাঁর চেনা জানা ও শোনা। তাই চট্টগ্রামের সৌন্দর্য ও সজীবতা প্রকাশ করেছেনে মনপ্রাণ উজাড় করে। ভালোবাসার শহর চট্টগ্রাম। প্রবন্ধের শেষে প্রাবন্ধিক আবেগাপ্লিত হয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কয়েক ছত্র বলেছেন।
‘তোমার সংকল্প¯্রােতে ভেসে যাবে লোহার গরাদ
এ তোমার নিিিশ্চত বিশ্বাস।
তোমার প্রতিজ্ঞা তাই আমার প্রতিজ্ঞা, চট্টগ্রাম।
আমার হৃৎপিÐে আজ তারি লাল স্বাক্ষর দিলাম।’
সপ্তম প্রবন্ধ‘হালদার কান্না শুনবে কে? এই প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক হালদার বুক চিড়ে যে রক্ত বের হচ্ছে। ক্ষত-বিক্ষত ওর দেহ মন সেই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন,‘প্রকৃতপক্ষে না আমরা নিজ দেশকে ভালোবাসি, না দেশের মানুষকে।’ এই বচনটি আমাদের ভাবিয়ে তোলো। বিবেককে নাড়া দেয়।
অষ্টম প্রবন্ধ ‘বাবার প্রতি ভালোবাসা’-এখানে এসে প্রাবন্ধিক এক আবেগের ঝড়ো বাতাস তুললেন। ‘বাবা তো চায় শুধু সন্তানদের সুখ।’ সমস্ত প্রবন্ধের কোল জুড়ে কেবল বাবারই প্রশংসা। আর অবশেষে ‘আর আমরা সেই বাবাকেই ভালোবাসতে জানি না, দেখাতে পারি না কৃতজ্ঞতা।’ আহ বাবার প্রতি ভালোবাসা দেখে মনটি ভরে যায়। এভাবেই দেশের প্রতিটি সন্তান যেন বাবা ও মাকে ভালোবাসে সে প্রত্যাশা করি।
নবম প্রবন্ধ ‘শিশুর প্রতি পাশবিকতা, কোন সমাজে বসবাস করছি।’ এই প্রবন্ধটি লোমহর্ষক। এখানে শিশুদের প্রতি নির্যাতনের যে ভয়াল চিত্র প্রাাবন্ধিক তুলে ধরেছেন তা েেদখে ভয়ে শিহরিত হই। এভাবে সোনার বাংলা শেষ হতে পারে না। এই চিত্রের আড়ালে আবডালে যা আছে প্রাবন্ধিক তুলেও ধরেছেন। এখানে আমরা চমকে যাই। থমকে গিয়ে এসব নিয়ে ভাবনায় কূল পাই না।

দশম প্রবন্ধ ‘সড়ক কবে নিরাপদ হবে?’ এই প্রবন্ধে লেখক সড়কের বেহাল অবস্থা একদিকে তুলে ধরেছেন আর অন্যদিকে এ সমস্যা সমাধানের পথ কিছুটা বাতলেও দিয়েছেন।
একাদশ প্রবন্ধ ‘ছাত্র রাজনীতি এবং নির্বাচন’। প্রবন্ধের ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের বঙ্গবন্ধুকেও আমরা ছাত্র রাজনীতি থেকে পেয়েছি।’ কিন্তু হায় ছাত্র রাজনীতির বিষবাষ্পে আজ অনেক কিছুই আমাদেরকে ব্যথিত করছে। লেখকের আক্ষেপ, ‘আসলে এসব লিখেও কী হবে। পরিবর্তন নেই কিছুর। প্রতিবাদ করলে, লিখলে, ভুল দেখিয়ে দিলে- যেন সবকিছু দ্বিগুণ বেড়ে যায়।’ প্রাবন্ধিকের আশঙ্কায় আমরা হতচকিত। ‘ছাত্র রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে সচেতন হতে হবে বড়দের।’
দ্বাদশ প্রবন্ধ ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে সকলের ভূমিকা প্রয়োজন।’ জনসচেতনামূলক লেখাটির মাঝে এক জীবনের সারৎসার আছে। মানুষ বিপদে পড়লে আরেকজন এগিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত। কিন্তু এমন অনেক দুর্ঘটনা আছে যে আমাদের অনেকেই বিপদগ্রস্তকে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে তা ভিডিও করে লাইক আর কমেন্ট পাবার জন্য ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। অথচ দুর্ঘটনায় কবলিত মানুষটিকে বাঁচানো আমাদের দায় ও দায়িত্ব। ওরা আমাদের মতোই মানুষ। লেখক এখানে আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষদের বর্ণনা করতে গিয়ে দুঃখ করেই বলেছেন ‘অর্থহীন শুধু সাময়িক সমবেদনা দেয়ায় আমাদের কাজ। বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের কারও প্রতি কোনো দয়ামায় নেই।’ এটা লেখকের আক্ষেপ হলেও এটা আক্ষেপ নয়, এটা সাধরণকে জাগিয়ে তোলার এক মহামন্ত্র।

ত্রয়োদশ প্রবন্ধ ‘কারিগরি শিক্ষা হোক দুর্নীতি মুক্ত’- এই প্রবন্ধে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনার পাশাপাশি এই শিক্ষার যে দুর্নীতির আখড়া তা বোঝা যায়। সমাধানের পথটিও খোঁজা জরুরি।
চতুর্দশ প্রবন্ধ “জুয়া” একটি জীবন নষ্টের হাতিয়ার।’ প্রবন্ধের নামের মাঝে প্রবন্ধের সার্থকতা দেখতে পাই। সমাজের পরতে পরতে বেকারত্ব আছে। আর এই বেকারেরাই জুয়া নামক জীবন ধ্বংসকারী খেলায় মেতেছে। প্রাবন্ধিক বলেছেন,‘ জুয়ার এই নেশা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন অধিক পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।’ আমাদেরও এই রকমি ধারণা। যত বেশি কর্মসংস্থান তত বেশি ব্যস্ততা আর যত ব্যস্ততা তত মানুষ কর্মচঞ্চল।
পঞ্চদশ প্রবন্ধ ‘দান করুন গোপনে।’ দান-সদকা গোপনেই করতে হয় নইলে বিড়ম্বনা বাড়ে- এই প্রবন্ধে এটাই প্রতিপাদ্য বিষয়। নব্য যাকাতবাজদের ধিক্কারও দেওয়া হয়েছে ।

ষোড়শ প্রবন্ধ ‘এ প্রজন্ম বিজয় দিবসে গর্বিত।’ ‘দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কারণ আজ আমরা স্বাধীন এবং বিজয়ী দেশ।’ কিন্তু তারপরও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েইে চলেছে। ফলে সমস্যা আর সমস্যায় গোটা বাংলাদেশ যেন কোণঠাসা হয়ে যাবার উপক্রম। এই সমস্যার সমাধান চায় এ প্রজন্ম। এই প্রবন্ধটি তরূণ সমাজের এক বেদনাময় আলেখ্য।
সপ্তদশ প্রবন্ধ ‘ঘুষ ছাড়া মিলে না চাকরি।’ ঘুষ ছাড়া চাকরির সোনার হরিণটি দেয় না ধরা এই অপ্রিয় সত্য কথাটি বারবার ফিরে ফিরে এসেছে এই প্রবন্ধে।
অষ্টাদশ প্রবন্ধ ‘কলড্রপ আর চাঁদাবাজ একই সূত্রে গাাঁথা’- এই প্রবন্ধে সমাজ সচেতন লেখক কলড্রপের নামে কত টাকার অপচয় হচ্ছে তার একটা প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করেছেন। ‘যে হারে মোবাইল গ্রাহক বেড়েছে, সে হারে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, হালনাগাদ বা সম্প্রসারণ না হওয়া’র ফলে এ সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এটার সমাধান হোক।
উনবিংশ প্রবন্ধে (বর্ষা মানে কী দুর্ভোগ?) লেখক বর্ষার দুর্ভোগ আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে আজকে আমাদের কাছে স্বস্তির বৃষ্টিটাও অস্বস্তির মনে হয়।’ এই তো একজন জাত লেখকের বৈশিষ্ট্য সমস্যার মধ্যেই সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া- যা এই সময়ের সমাজ সচেতন লেখক আজহার মাহমুদ এর মাঝে বিদ্যমান।

বিংশ প্রবন্ধ ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণ বাড়াচ্ছে।’ প্রবন্ধটি যেন সমাজের প্রতি এক চপেটাঘাত। ‘প্রেম মানে শরীর দেওয়া নেওয়া নয়।’ প্রাবন্ধিকের এমন সমাজ সচেতন দৃষ্টিভঙ্গিই বোধ করি সমাজের লোলুপ দৃষ্টিধারী বেচারাদের কিছুটা হলেও বিবেক জাগ্রত করাবে।
একবিংশ প্রবন্ধ ‘ধর্মকে আঘাত করা অবাঞ্ছনীয়’-এই প্রবন্ধটি ‘যে ধর্মেরই মানুষ হোক না কেন, প্রতিটি ধর্মই ন্যায় ও সত্যের পক্ষে।’ আর তাই প্রীতি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়লেই এই সমাজের কিছু ধর্মান্ধ মানুষেরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লিপ্ত থাকে। অথচ ‘সকলের ধর্ম এক এবং ঐক্য হলেইতো দেশ এগিয়ে যাবে।’
দ্বাবিংশ প্রবন্ধ ‘গণপরিবহনের যত অনিয়ম’-প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছে,‘আইন আছে, ট্রাফিক পুলিশও আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। তাই গণপরিবহনের শৃঙ্খলা দিন দিন ভেঙে পড়ছে।’ প্রাবন্ধিক অত্যন্ত সূক্ষè ও সচেতনভাবে গণপরিবহনের যে বাস্তবতা বর্ণনা করেছেন তা আমাদেরকে সচেত করে। সরকার বাহাদুরকে ভাবিয়ে তোলে।
ত্রয়োবিংশ প্রবন্ধ ‘অপসংস্কৃতিই এখন আমাদের সংস্কৃতি’-‘বিনোদন মানে শুধু আনন্দ নয়, বিনোদন মানে আনন্দর মাঝে জ্ঞান আহরণ করা।’ লেখকের সাথে আমরাও একমত।
চতুর্বিংশ প্রবন্ধ ‘চাই বাধাহীন আনন্দ’ নববর্ষ পালনে সময় বেঁধে দেওয়াকে উপজীব্য করে লেখক এই প্রবন্ধটি লিখেছেন। ‘এই স্বাধীন দেশে বাংলার মানুষ স্বাধীনভাবে আনন্দ করবে এবং বাংলা নববর্ষ পালন করবে এটাই বাঙালিদের চাওয়া’

পঞ্চবিংশ প্রবন্ধ ‘মার্চ’ বাঙালির গৌরবের মাস’-এই প্রবন্ধটির উঠোন জুড়ে একদিকে মার্চের উত্তাল চিত্র ঝলক দেয়। অপর দিকে ‘বিশ্ব শিশু দিবসের প্রাসঙ্গিকতাও এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবেই।
ষট্বিংশ প্রবন্ধ ‘মেধা নয় টাকাই যেনো শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি।’ ‘একজন মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থী মানে একটি দেশের সম্পদ। আর এই সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার, আমার, সকলের।’ মেধার জায়গা যখন টাকা নামক দানব গ্রাস করে তখন মেধাবীদের কোনো দাম থাকবে না। এক সময় এদেশে প্রশ্ন ফাঁস নামক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল আর সেই বিষয়টি নিয়ে সচেতন ভঙিমায় প্রবন্ধ লিখলেন বর্তমান সময়ের আলোচিত ফুল সদৃশ আজহার মাহমুদ।

সপ্তবিংশ প্রবন্ধ ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ’ নামক প্রবন্ধ নামক চিত্রকল্প দিয়ে প্রাবন্ধিক তাঁর গ্রন্থটির পরিসমাপ্তি টেনেছেন। ‘আমাদের বছর বাংলা, আমাদের সাল বাংলা কিন্তু আমরা চলি ইংরেজি সালে’-এটা লেখকের আফসোসের কথা। আমাদের কেন জানি ‘অপ’ শব্দটিই বেশি পছন্দ। অপসংস্কৃতি আমাদের না মেরে আর ছাড়বে না। বাংলা নববর্ষের আনন্দ আমাদেরকে যতটা না পাগল করে ইংরেজি নববর্ষ তার চেয়েও ঢের মাতাল করে তোলে। এই প্রবন্ধটিতে ‘বাঙালির প্রাণ পহেলা বৈশাখকে আরও অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন বাঙালির স্বকিয়তা ধরে রাখা। তবেই বাঙালির প্রাণ বাঁচবে।’ বিষয়টি বোঝা যায় সহজে।
একজন প্রাবন্ধিক শুধু প্রাবন্ধিক নয়, সমাজ সংস্কারকও বটে। ‘খোলামেলা অনুভূতি’র লেখক আজহার মাহমুদ অতি সুক্ষè দৃষ্টিতে সমাজের অসুখগুলোকে তুলে এনেছেন। সমস্যাগুলো বলার পাশাপাশি সমাধানের রাস্তাও বলে দিয়েছেন। মনে হয় তিনি যাদুকর হলে সমাজের সকল অন্যায়, অত্যাচার আর অবিচারের সকল লাগাম টেনে ধরে যাদুর ছোঁয়া দিয়ে সব নির্মূল করে দিতেন।

সমাজ সচেতন লেখক আজহার মাহমুদ। তার প্রতিটি লোখাই যেন সম্মোহনী শক্তি বিরাজমান। একজন পাঠক বইটি পড়তে বসলে শেষ না করে ঊঠতে পারবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। ছোট ছোট বাক্য ব্যায়ে লিখেছেন। বিরামচিহ্ন যথাযথ পালন করা হয়েছে বলে মনে হয়। তবে বানানের ব্যাপারে আরেকটু মনোযোগী হলে বোধ হয় বানান বিভ্রাট ঠেকানো যেত।

রাজা রামমোহন রায় এর ‘বেদান্ত গ্রন্থ’, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর ‘ব্রজবিলাস,’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাম্য’ ‘লোক রহস্য’ ‘কমলাকান্তের দপ্তর,’ মীর মশাররফ হোসেনের ‘গোজীবন,’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সভ্যতার সংকট,’ ‘সাহিত্য,’ ‘আধুনিক সাহিত্য,’ প্রমথ চৌধুরী’র ‘বীরবলের হালখাতা’সহ বিভিন্ন কালের বিভিন্ন লেখকদের লেখাগুলো যেমন বাংলার সম্পদ হয়ে আছে। ঠিক তেমনি আধুনিক সময়ের মেধাবী, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান লেখক আজহার মাহমুদের লেখাও বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস। এই জাত লেখক আরও উত্তরোত্তর সামনে এগিয়ে যাবে-এই সুন্দর মুহূর্তে এটাই প্রত্যাশা করি। বইটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।

লেখক: প্রভাষক (বাংলা), মাসকাটাদীঘি স্কুল এন্ড কলেজ, পবা,রাজশাহী

আরও পড়ুন:- খোলামেলা অনুভূতি বইয়ের রিভিউ প্রতিযোগীতার ফলাফল ঘোষণা করা হলো

তারুণ্যের জয়গাঁথা – খোলামেলা অনুভূতি
মোঃ তাসনিম হাসান আবির

প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম শাখা। কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তির উপর ভিত্তি করে লেখক কোন বিষয় সম্পর্কে সচেতনভাবে যে নাতিদীর্ঘ সাহিত্য সৃষ্টি করেন, তাকেই প্রবন্ধ বলে। প্রবন্ধ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। এর উৎপত্তিগত অর্থ ‘ প্রকৃষ্ট বন্ধন’। বর্তমানে কেবল গদ্যে রচিত ভাব, কল্পনা, আর তথ্য সমৃদ্ধ মননশীল রচনাকেই প্রবন্ধ বলা হয়ে থাকে। উচ্চারণ, ভাব ও ভাষা – এই তিনটিই প্রবন্ধের প্রাণ। প্রত্যেক প্রবন্ধে কিছু প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। যথার্থ যুক্তি, তথ্য প্রমাণ, নিরাবেগ ভাষা আর সংযত চিন্তার প্রয়োগে সেই প্রতিপাদ্য বিষয়কে রূপায়ন করাই প্রবন্ধের লক্ষ্য।

যেকোনো বিষয় নিয়ে বিস্তৃত অথচ পরিমিত আলোচনা অপূর্ব রচনাশৈলী আর ভাষাগত দক্ষতার নিপুণভাবে বর্ণনা করাই হলো প্রবন্ধ।

বই পড়া আমার সেই ছোটবেলা থেকেই একটি অভ্যাস। এবং বই পড়ার পর সেটা নিয়ে আলোচনা করা বিবেক জাগ্রত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত বিষয়। তারই ধারাবাহিকতায় তরুণ লেখক ‘ আজহার মাহমুদ’ এর ‘ খোলামেলা অনুভূতি’ প্রবন্ধগ্রন্থটি পড়া শেষ করলাম। যদিও লেখক এই লেখালেখির জগতে একদমই তরুণ, তবে তার লেখায় কখনও বিতৃষ্ণা হয় নি। বইটি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওইদিন রাতেই একটানা পড়ে শেষ করেছি। কিভাবে যে সময় চলে গিয়েছিলো, বুঝতেই পারি নি। ২৭ টি প্রবন্ধ নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বইটি। অসাধারণ ভাষাশৈলী আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে ভরা এই বইটি। এবং প্রতিটি লেখায় দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। এটি লেখকের ২য় প্রবন্ধগ্রন্থ। এরআগে তিনি ‘প্রশান্তির পথ’ নামে আরেকটি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেন। তার প্রতিটি প্রবন্ধই সমাজ সংস্কারে এবং তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার।

বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটি হচ্ছে, ” আমাদের শ্রবণ শক্তি কেড়ে নিচ্ছে ‘শব্দ- সন্ত্রাস ‘ “। লেখক এখানে শব্দ দূষণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। লেখক বর্ণনা করেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব মোতাবেক যে কোনো শহরে শব্দের মাত্রা দিনে সর্বচ্চ ৪৫ ডেসিবল এবং রাতে ৩৫ ডেসিবল পর্যন্ত সহনীয়। শয়নকক্ষের জন্য ২৫ ডেসিবল পর্যন্ত। অফিস আদালতের জন্য ৩৫-৪০ এবং হাসপাতালের জন্য ২০-২৫ ডেসিবল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটা মানা হয় না। লেখক এখানে শব্দ দূষণের কারণ, শব্দ দূষণের ফলে কি কি ক্ষতি হয় বা এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত, তথ্য -প্রমাণ নির্ভর ও গবেষণামূলক লেখা লিখেছেন।

দ্বিতীয় প্রবন্ধটি হচ্ছে, ” একুশ বাঙালির গর্ব এবং অহংকার”। বাঙালি জাতির ঐতিহ্যময় ও গৌরবের ভাষা বাংলা। লেখক এখানে বাঙালি জাতিসত্তার গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটিকে আবেগ ও তথ্য দিয়ে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির পটভূমি তুলে ধরেছেন। এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার পেছনের গল্প ও মানুষকে নিয়ে আলেচনা করেছেন। লেখক বর্তমানে বাংলা ভাষার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। তার মতে, আমাদের ভাষা আজ বাংলিশে পরিণত হয়েছে। তিনি বাংলার থেকে ইংরেজী ভাষা বর্তমানে এদেশে বেশি বিস্তৃতির আক্ষেপ করেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য সংস্কৃতির গান লাগিয়ে উৎসব করার ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি বাংলাকে মন থেকে ভালবাসার কথা বলেছেন। এবং প্রতিটা মাসকেই বাংলা ভাষার মাস হিসেবে উদযাপনের কথা বলেছেন।

“কালের কলস থমকে গেলো” এই শিরোনামে লেখকের পরবর্তী লেখাটি ছিলো খুবই মর্মস্পর্শী। কারণ এখানে তিনি কবি আল মাহমুদ কে নিয়ে লিখেছেন। কবির প্রতি তার অগাধ ভালবাসার কথা বলেছেন। এবং কবির নামের শেষের শব্দের সাথে নিজের নামের শেষের শব্দের মিল থাকায় গর্ববোধ করেছেন। কবির জীবনী তিনি সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই কবি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কবির প্রথম কবিতা প্রকাশ পায়। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর তাকে সর্বপ্রথম স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় পা রাখেন। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। তিনি ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৯ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ৮২ বছর বয়সে কবি ইন্তেকাল করেন।

পরবর্তী প্রবন্ধ ” আমাদের সবচে’ বড় শক্তি স্বাধীনতা”। এখানে মূলত লেখক আমাদের পরাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। কাগজে কলমে হয়তো আমরা স্বাধীন কিন্তু আসলে আমরা কোন না কোন জায়গায় বা কারও না কারও কাছে পরাধীন। স্বাধীন শুধু আমাদের দেশ। লেখক এখানে নিজের দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এখানে আমাদের আগে নিজের পরিবার, মহল্লা, জেলা থেকে নিজেকে স্বাধীন করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর প্রতিটা সম্পর্কে অন্যকে স্বাধীনতা দিতে হবে। তাহলেই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যাবে।

” বই হোক জীবনের সঙ্গী” লেখাটি পড়তে খুবই ভাল লাগলো। বই আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু। সবাই ধোঁকা দিলেও বই কখনো ধোঁকা দেয় না। অবসর সময় কাটানোর জন্য পৃথিবীতে অনেক কিছুই সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু বইয়ের জায়গা কেউ নিতে পারে নি। লেখক এখানে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। সমাজের নোংরা ও অপকর্ম করা ব্যক্তিদের তাদের এসব কাজ বাদ দিয়ে বই পড়ার প্রতি উৎসাহ দেখিয়েছেন। একটি জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই, সে বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।

পরের প্রবন্ধটি ছিলো ” বদলে যাওয়া চট্টগ্রাম ” শিরোনামে। লেখাটি অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ৫২৮৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের জেলাটিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাজধানী বা অর্থনীতির প্রাণও বলা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রামের ব্যাপক উন্নয়নের কথা এখানকার জনগণ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে। এ সরকারের আমলে শাহ আমানত সেতু( কর্ণফুলী ব্রীজ), আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার, আগ্রাবাদ জাম্বুরী পার্ক, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, নগরীর সিটিগেটসহ অসংখ্য উন্নয়ন কাজ হয়েছে।

“হালদার কান্না শুনবে কে” লেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। কারণ বর্তমানে হালদা যে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে এটা নিয়ে সরব হওয়া লেখকের অসাধারণ দায়িত্ববোধের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। নদীতে নিয়মিত লোভী, দুর্বৃত্ত, ভূমিদস্যু, মৎস শিকারীরা আক্রমণ করছে। রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে নদীর পানি দূষিত করা হচ্ছে। আর তাই হালদাকে বাঁচানোর তাগিদে প্রশাসনকে এটির পাশে দাঁড়াতে আহ্বান করেছেন লেখক।

পরের প্রবন্ধটি “বাবার প্রতি ভালবাসা” পড়তে গিয়ে খানিকটা আবেগপ্রবণ হয়ে গেলাম। কারণ বর্তমান সমাজে বাবার প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান খানিকটা কমে গিয়েছে। অথচ আমাদের সকল খুশির পেছনের কারিগর আমাদের বাবা। যিনি ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করেন। এ বিষয়টি লেখক খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে লেখক বলেছেন, বর্তমান সময়ে মা দিবস যেভাবে পালন করা হয়, বাবা দিবস ওভাবে পালিত হয় না। তিনি মা বাবার প্রতি পার্থক্য না করতে বলেছেন। কারণ তারাও আমাদের প্রতি কখনও পার্থক্য করেন না।

“শিশুর প্রতি পাশবিকতা, কোন সমাজে বসবাস করছি?” প্রবন্ধটি ছিলো একটি মানবিক ঘরোনার। লেখক শিশুদের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়কে গভীরভাবে উপলব্ধি করে তাদের নিয়ে কলম তুলেছেন। তিনি রাজধানীর ডেমরায় বাসায় খাটের নিচ থেকে দুটি শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি বলেছেন, সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গাবতলা গ্রামে শিশু ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করেছেন, রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এনেছেন। তিনি শিশু ধর্ষণের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিসংখ্যান এনেছেন। রাষ্ট্রকে এর বিরুদ্ধে ন্যায় করতে বলেছেন।

পরবর্তী প্রবন্ধটি ছিলো ” সড়ক কবে নিরাপদ হবে?” শিরোনামে। সড়কে নিয়মিত মৃত্যুর মিছিল যেনো থামছেই না। এত আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ,ধর্মঘট করে আসলে কিছুই লাভ হলো না। লেখক এ বিষয়ে তার মন্তব্য তুলে ধরেছেন এবং বিভিন্ন পরিসংখ্যান এনেছেন। তিনি যানবাহন সেক্টরের দুর্নীতি নিয়েও কথা বলেছেন।

“ছাত্র রাজনীতি ও নির্বাচন” নিয়ে লেখা প্রবন্ধটি আমার খুব পছন্দের ছিলো। কারণ এবিষয়টা নিয়ে পড়তে ও লিখতে আমি পছন্দ করি। তিনি বর্তমান ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বলেছেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর হওয়া ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বলেছেন। ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

পরবর্তী প্রবন্ধটি ছিলো “আগুন নিয়ন্ত্রণে সকলের ভূমিকা প্রয়োজন” শিরোনামে। লেখাটি বর্তমান সময়োপযোগী। এখন আগুনে পুড়ে মৃত্যু বা আহত হওয়া অনেক বাড়ছে। লেখক এখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে সকলের ভূমিকা চেয়েছেন। কোথাও আগুন লাগলে সেখানে মোবাইলে ভিডিও না করে আগুন কমানোর প্রচেষ্টা করতে বলেছেন। নিয়মিত আগুন কেনো লাগছে সে বিষয়ে লেখক তার নিজস্ব কিছু চিন্তা তুলে ধরেছেন। তিনি অপরিকল্পিত নগরায়নের প্রতি নিরুৎসাহিত করেছেন এবং ফায়ার সার্ভিসকে আরও উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

“কারিগরি শিক্ষা হোক দুর্নীতি মুক্ত” শিরোনামের লেখাটি বর্তমান সময়োপযোগী। কারণ কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লেখকের মতে এই সেক্টরেও এখন চলছে দুর্নীতি। যেটা ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই হুমকিস্বরুপ। তিনি এই সেক্টরে দুর্নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন ত্রুটিও তুলে ধরেছেন। এবং সরকারের কাছে এসব বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

” এ প্রজন্ম বিজয় দিবসে গর্বিত” শিরোনামের লেখাটি লেখক তার মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখেছেন। এ প্রজন্ম ৭১ কে না দেখেও তারা ইতিহাস জেনে গর্বিত হয়, তারা ৭ মার্চ নিয়ে গর্বিত হয়, তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্বিত হয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গর্ব করে। লেখক মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ শুধু বিজয় দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটা দিনেই উদযাপন এর কথা বলেছেন। তিনি স্বাধীনতার এত বছরে এসে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের কথা বলেছেন। তিনি বর্তমান প্রজন্মের বিভিন্ন চাওয়া সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতার এ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশের বিভিন্ন দিকও তিনি তুলে ধরেছেন। আর নতুন প্রজন্মকে সার্বিক বিজয় এনে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

“মেধা নয় টাকাই যেনো শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি” শিরোনামের প্রবন্ধটিও লেখকের পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা। এখানে তিনি শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথা বলেছেন। তার মতে, বর্তমানে মেধার থেকে টাকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। তিনি প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষায় জালিয়াতি, পরীক্ষার কেন্দ্রে নকল, টাকার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা কেনাবেচা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি চাকরির বাজারে টাকার ছড়াছড়ি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি এই অবস্থার থেকে উত্তরণের জন্য সকলকে মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

লেখকের এই বইয়ের সর্বশেষ প্রবন্ধটি ছিলো ” পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ” শিরোনামে। এই লেখাটি একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। পহেলা বৈশাখ আমরা নববর্ষ পালন করি। কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, আজকাল মানুষ এটাকে শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। বাংলা সন কত বা বাংলা তারিখ কত এটা বেশিরভাগ বাঙালিই বলতে পারবে না। এখন বাংলার থেকে ইংরেজীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যার ফলে বাংলা,ইংরেজীর মিশ্রণে একটা বিকৃত ভাষা তৈরি হচ্ছে। লেখক এই বিষয়টিই বর্ণনা করেছেন। তিনি পহেলা বৈশাখে উদযাপিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি এই উৎসবকে সুস্থ ও সুন্দরভাবে পালনের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

লেখকের পুরো বইটি পড়ে কিছুকিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে এখানে লেখক ঢালাওভাবে দোষারোপ করেছেন। যেমন: “মেধা নয় টাকাই যেনো শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি” শিরোনামের লেখাটির সাথে আমি একমত না। কারণ এখানে অভিযোগ সার্বিকভাবে দেওয়া হয়েছে। টাকা দিয়ে হয়তো কিছু জায়গায় মেধা বিক্রি হচ্ছে তবে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এখনও সরকারী চাকরিগুলা মেধার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেয়। এবং ঢাবি,বুয়েট সহ শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে। তাছাড়া কিছু কিছু প্রবন্ধের শিরোনাম আমার যুক্তিযুক্ত মনে হয় নি। যেমন: “ঘুষ ছাড়া মেলে না চাকরি”।

“ছাত্র রাজনীতি এবং নির্বাচন” এই প্রবন্ধটিতে আমার মনে হয় গতবাঁধা তথ্য দেওয়া হয়েছে। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনকে নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেটার আদতে কতটুকু সত্যতা আছে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হয়ে আমি নিজে প্রত্যক্ষভাবে ডাকসু নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছি। তাই এখানে অনেক তথ্যই ওই গতবাঁধা মিডিয়ার নিয়মিত অভিযোগের মত মনে হয়েছে।

তাছাড়াও বইটিতে অনেক শব্দের বানান ভুল ছিলো। এটার দিকে লেখকের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। আর পুরা বইয়ে আমার মনে হয়েছে সাহিত্যরস একটু কম ছিলো। কারণ প্রবন্ধনির্ভর বই হলেও এত তথ্য আর কঠোরতার সাথে আরও কিছু রোমান্টিক বা মজার প্রবন্ধ থাকলে বিষয়টা আরও উপভোগ্য হতো। তাছাড়া এখানে সবগুলো প্রবন্ধই পত্রিকায় প্রকাশিত। তাই কিছু মৌলিক প্রবন্ধ থাকলে মনে হয় আরও ভাল হতো।

” খোলামেলা অনুভূতি” নামটি শুনে আমি কিছু প্রেমনির্ভর বিষয় আশা করেছিলাম। হয়তো লেখক তার একান্ত ব্যক্তিচিন্তা প্রকাশ করেছেন বলে এই নামটি দিয়েছেন। তবে আমার মনে হয় এখানে আরও বিকল্প ভাবা উচিত ছিলো। আশাকরি লেখক ভবিষ্যতে এবিষয়টা ভেবে দেখবে।

প্রিয় বাক্যঃ
১. কেউ না কেউ কারো না কারো কাছে পরাধীন।
২. প্রেম মানে শরীর দেওয়া নয়।
৩. জ্ঞান চর্চা মানুষকে যেমন মহৎপ্রাণ করে তোলে, তেমনি চিত্তকে মুক্তি দেয় মানবাত্মাকে জীবনবোধে বিকশিত করে।

পরিশেষে, লেখক আজহার মাহমুদকে ধন্যবাদ জানাতে চাই তার “খোলামেলা অনুভূতি” বইটি প্রকাশের জন্য। তার সৃজনশীলতার প্রতি সম্মান জানাতে চাই। তার এই বই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এবং বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের একটি পথিকৃৎ হয়ে থাকবে। তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করবে বই লেখার প্রতি। আর আশাকরি লেখক তার এই প্রচেষ্টা সবসময় অব্যাহত রাখবে এবং তিনি আমাদেরকে আরও ভাল ভাল বই উপহার দিবেন।

লেখক: মোঃ তাসনিম হাসান আবির
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
কেন্দ্রীয় সম্পাদকীয় পর্ষদ,
বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।

 

খোলামেলা অনুভূতি ও কিছু কথা
ফাহিম আকন্দ

লেখক_পরিচিতিঃ বইটি লিখেছেন তরুণ কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, লেখক আজহার মাহমুদ। তার জন্ম ১২ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালি উপজেলার ১০ নম্বর চাম্বল ইউনিয়নের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা মাহমুদুল হক আনসারী একাধারে একজন সংগঠক, লেখক, গবেষক এবং বুদ্ধিজীবী। মাতা ছাবেকুন নাহার শেফা একজন সমাজ সেবিকা। লেখকের জন্ম বাঁশখালি উপজেলায় হলেও বাবার কর্মস্থলের কারণে তার শৈশব, কৈশোর কাটে চট্টগ্রামের সিটিগেইট এলাকায়। লেখক কুমিরা আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি এবং পরবর্তীতে পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হিসাব বিজ্ঞানে অনার্স করছেন। বাবার অনুপ্রেরণার ফলে লেখক বিগত চার বছর যাবৎ দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকায় এবং ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। “খোলামেলা অনুভূতি” লেখকের দ্বিতীয় প্রবন্ধগ্রন্থ। তার লেখা প্রথম প্রবন্ধ গ্রন্থটির নাম “প্রশান্তির পথ”।

বিষয়_কী_ও_কেন_পড়বেনঃ লেখক আজহার মাহমুদ রচিত ‘খোলামেলা অনুভূতি’ মূলত একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। সমসাময়িক ঘটনাবলীর উপরে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত মোট ২৭ টি প্রবন্ধ দিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। বইটি সকল বয়সী পাঠকদের জন্যই উপযোগী। লেখকের গবেষণাধর্মী এই বইটিতে উঠে এসেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দেশের সমসাময়িক কিছু সমস্যা, এর কারণ, প্রতিকার, নির্মূল ব্যবস্থা খুবই বিশ্লেষণী ভঙ্গীতে তিনি তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। বেশ কিছু সমস্যা যা আমাদের দেশে এখন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে লেখক এই বইটিতে সে সকল সমস্যার কারণ, প্রতিকার খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। আশা করি বইটি সকল পাঠকদেরকে কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ করবে।

পাঠ্যানুভূতিঃ লেখকের এই বইটি খুবই সাবলীলভাবে রচিত বিধায় বইটি অনেকটাই সুখপাঠ্য হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমিও বর্তমানে দেশের মারাত্মক কিছু সমস্যা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। লেখকের এই বইটি পড়ার পর আমার চিন্তার সীমা অনেকটাই প্রসারিত হয়েছে। বেশ কিছু প্রশ্নের আমি আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি আবার এমন কিছু প্রশ্নও পেয়েছি যার উত্তর আমি বের করতে পারিনি। সমাজের ইতিবাচক, নেতিবাচক উভয় বিষয়েই আমি কিছুটা সুধারণা অর্জন করতে পেরেছি।

সুখকর_নয়_যেসবঃ বইটির একটা মাত্র বিষয় আমাকে খুব পীড়া দিয়েছে। যা হলো বানানে প্রচুর অসঙ্গতি। প্রতি পৃষ্ঠাতেই কিছু না কিছু বানান ভুল আমার পড়ার প্রতি এক টানা মনোযোগ ধরে রাখতে বাঁধার সৃষ্টি করেছে। একটি বই অধ্যয়ন করে তখনই সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগ করা যায় যখন বইটির প্রতিটি শব্দ, বাক্য হয় নির্ভুল। এ বই-য়ে বানানে অসঙ্গতি গুলো ছিল পরিষ্কার, জ্বলজ্বলে।

আলোচনায়ঃ প্রতিটি বই নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এতে লেখকের ভুলগুলো সংশোধন করার উপায় বের হয়ে আসে। এই বইটিরও ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। পাঠকমহলে বইটির যত আলোচনা হবে বইটি ততটাই নিখুঁত হয়ে উঠবে। আমার নজরে বইটি যথাসম্ভব সমালোচনামুক্ত রইলো। বইটির প্রাঞ্জল বক্তব্য, লেখকের বিশ্লেষণধর্মী লেখনী এক কথায় অনবদ্য।

প্রিয়_লাইনগুলোঃ
১. আমরা ভুলে যাচ্ছি “অ আ ই এ ও ক খ গ ও ব ড ত” এসব বর্ণমালাকে। আমাদের ভাষা হয়ে গেছে আজ বাংলিশ। আমরা আজ ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে এসব লিখছি। কতটা বেদনাদায়ক এ বিষয়টি সেটা বাংলা ভাষাকে ভালো না বাসলে বুঝা মুশকিল। (একুশ বাঙালির গর্ব ও অহংকার; পৃষ্ঠা-৮)
২. অবসর সময়গুলো বিনোদনের মাধ্যমে কাটানোর জন্য কত কিছুই না আবিষ্কৃত হয়েছে পৃথিবীতে, কিন্তু বই পড়ার মতো নির্মল আনন্দের কাছে সেগুলো সমতূল্য হতে পারেনি। (বই হোক জীবনের সঙ্গী; পৃষ্ঠা-১৬)
৩. বাবার সেই চিন্তার ভাগ নেওয়ার মতো কেউই থাকে না। বাবাকে একাই তার চিন্তার ভার নিয়ে চলতে হয়। (বাবার প্রতি ভালোবাসা; পৃষ্ঠা-২৫)
৪. প্রেম মানে শরীর দেওয়া নেওয়া নয়। কিন্তু ধর্ষক চিনে শরীর। (বিচারহীনতার সংস্কৃতিই ধর্ষণ বাড়াচ্ছে; পৃষ্ঠা-৪৯)
৫. টাকার কাছে আজ আমরা সবকিছুই বিলিয়ে দিয়েছি, কারণ আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় নেশা হচ্ছে লোভ। (মেধা নয় টাকাই যেন শিক্ষার্থীদের মূল শক্তি; পৃষ্ঠা-৫৯)
৬. আমরা বাংলা সন অনুযায়ী চলি না, বলি না, করি না। অথচ আমরা এসো হে বৈশাখ এসো হে…. করে গাইতে থাকি। (পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ; পৃষ্ঠা-৬১)
৭. যেকোনো জাতির কাছেই তার নিজ সংস্কৃতিই সেরা এবং আপন। (পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ; পৃষ্ঠা-৬৩)

লেখক: শিক্ষার্থী, দিগপাইত, জামালপুর সদর, জামালপুর

 

বইঃ খোলামেলা অনুভূতি
বইয়ের ধরণঃ প্রবন্ধগ্রন্থ
লেখকঃ আজহার মাহমুদ
প্রকাশনীঃ সাহিত্য রস প্রকাশনী
প্রচ্ছদঃ শ.ই মামুন
প্রকাশকালঃ আশ্বিন-১৪২৬(অক্টোবর, ২০১৯)
মুদ্রিত মূল্যঃ ১৬০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা : ৬৪

বইটি পেতে এখানে ক্লিক করুন। এবং লেখকের ইনবক্সে যোগাযোগ করুন।

চস/আজহার

ads here