সমাজ-ধর্ম ও সামাজিক জীবনাচারণের নির্মম চিত্রের প্রতিচ্ছবি ‘আলোমতি’

57
  |  শনিবার, জানুয়ারি ২৩, ২০২১ |  ১২:১৫ অপরাহ্ণ
ads here

আরশাদ আল গালিব: জনপ্রিয় তরুণ লেখক মোহাম্মদ অংকন’র প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘আলোমতি’। তাঁর এই উপন্যাসে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে আমাদের এই সমাজব্যবস্থার নির্মম এক পরিণতির গল্প। সামাজিক দিক দিয়ে চারটি অসম প্রেমের রূপকার দেলওয়ার এবং রেখারূপী আলোমতি। সূচনালগ্নেই দেখা মেলে একজোড়া অসম প্রেমের চিত্র। প্রেম যদিও মানে না কোনো ধর্ম, বর্ণের প্রভেদ; কিন্তু আমাদের এই সমাজ! লেখকের সুনিপুণ কলমের ছোঁয়ায় প্রথমাংশে ফুটে উঠেছে সমাজের এই প্রভেদ ও বাঁধার চিত্র। তবে একদিন সব বাঁধা দূর করে তারা এগিয়ে চলে অচেনা শহরের পানে। বদলে যায় তাদের জীবনযাত্রা, রেখা আর্বিভূত হয় আলোমতি রূপে। কিন্তু দেলওয়ার! সে কি এখনো আগের মতই আছে? এ নিষ্ঠুর শহর কি তাকে সমান্তরালে রেখেছে? নাকি নিয়ে গেছে নদীর আঁকেবাঁকে! কেন একদিন দেলওয়ার প্রকারান্তে হত্যা করে আলোমতিকে? অতঃপর বাবা মেয়ে চলে আসে অন্য শহরে। গড়ে তোলে নির্ভাবনার এক জীবন। কিন্তু এক সময় পুনরাবৃত্তি শুরু হয় উপন্যাসের প্রথম অংশের! আবার জন্ম নেয় একজোড়া অসম প্রেম। আবার ঘটতে থাকে রোমাঞ্চকর কিছু ঘটনা। যা প্রথমে মোটেও অনুমান করা যায়নি।

ads here

উপন্যাসের শুরুটা হয় সুদর্শন যুবক দেলওয়ার আর ভিন্নধর্মী যুবতী রেখার পাগলপারা প্রণয়ের মাধ্যমে। তাদের প্রেম বিনিময়, লুকিয়ে দেখা করা, ভালোবাসার টানে একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাওয়া এভাবেই প্রথমে এগিয়ে যায় উপন্যাসের কাহিনি। কিন্তু একটা সময় প্রযুক্তির উৎকর্ষ ছন্দপতন আনে তাদের জীবনে। বদলে যায় তাদের ভবিষ্যতের দিক। জীবীকার টানে দেলওয়ার যখন ছুটে চলে যায় শহরের দিকে। তখন তাতে বাধ সাধে প্রণয়ী রেখা। সে-ও যেতে চায় দেলওয়ারের সাথে। কিন্তু ধর্ম! নাহ্, প্রেমের টানে পরাজিত হয় ধর্মের টান। সকল বাধা ছিন্ন করে এক নিশুতী রাতে অজানা জীবনের উদ্দেশ্যে অজপাড়াগাঁ ত্যাগ করে দেলওয়ার-রেখা প্রণয় জুটি। দেলওয়ার পিছনে রেখে যায় অসুস্থ পরনির্ভরশীল পরিবার। আর রেখা পিছনে রেখে যায় প্রাচুর্যপূর্ণ জীবন, বাবা-মা আর ধর্ম। প্রেমের এক অদৃশ্য তীব্র টানে পরাজিত হয় আজন্মের সকল বন্ধন, সকল বাঁধা। গ্রামে এ নিয়ে প্রথমে আলোড়ন উঠলেও রেখার পরিবারের ধর্ম রক্ষার আড়ালে মিথ্যা প্রচারে আবার নিস্তরঙ্গ হয়ে যায় গ্রামের ঢেউ। একদিন হয়তো তারা ভুলেও যায় এই প্রণয় জুটির কথা। সবই সময়ের ব্যবধান মাত্র।

কিন্তু শহরে এসে তারা মুখোমুখি হয় এক নির্মম বাস্তবতার। অচেনা শহরের এক কাজী অফিসে বিয়ে হয় দেলওয়ার আর রেখার। রেখা আর্বিভূত হয় আলোমতি রূপে। আর ওদিকে শহুরে জীবনের ঢেউয়ের দোলাচালে আর মাদকের টানে ছিটকে পড়ে দেলওয়ারের জীবন। আর ওদিকে সদ্য মা হওয়ার সিঁড়িতে পা রাখা আলোমতির চার দেয়ালের বদ্ধ জীবন কাটতে থাকে এক হতাশা আর না পাওয়ার বেদনাকে ঘিরে। মাতাল স্বামী আর একাকিত্বের যাতনা মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় আলোমতিকে। দাঁতে দাঁত চেপে অনাগত ভবিষ্যতের কল্পিত মুখের দিকে তাকিয়ে সব অনাদর আর অবহেলা নির্বিবাদে সহ্য করে যায় আলোমতি। কিন্তু একসময় সকল বাঁধ যেন ভেঙে পড়ে, সকল অত্যাচার নিশ্চুপে সয়ে যাওয়া আলোমতি একদিন মুখ খোলে, মুখর হয় প্রতিবাদে। কিন্তু মাতাল দেলওয়ারের নির্মম আঘাত ছোবল হানে আলোমতিকে।

অসুস্থ আর আঘাতপ্রাপ্ত আলোমতি একসময় ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে কিন্তু পৃথিবীর বুকে রেখে যায় তার স্মৃতিচিহ্ন এক নিস্পাপ শিশু। কিন্তু পাশ ফিরে দেখার সৌভাগ্যও হয়ে ওঠে না তার নিষ্পাপ নির্মল মুখ। ঘরে ফেরে দেলওয়ার, নিষ্প্রাণ আলোমতির দিকে তাকিয়ে নেশা ছুটে যায় তার। হত্যার দায়ে পড়ে চেতনা ফেরে তার। তবে পরক্ষণেই শিশুটির নিষ্পাপ মুখে তাকিয়ে বদলে যায় তার লক্ষ্য, তার মনে ভেসে ওঠে এই শিশুটিকে কেন্দ্র করে নতুন ভবিষ্যত গড়ে তোলার এক দুর্দমনীয় চেতনাবোধ। আর এই টানেই নিষ্প্রাণ মৃত আলোমতিকে পেছনে ফেলে মেয়েকে বুকে চেপে দেলওয়ার ছুটে চলে অন্য এক শহরে, অন্য এক নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। যার মূল কেন্দ্রবিন্দু সদ্যজাত এই মেয়েশিশু।

নতুন শহরে এসে অন্যের ঘরে শুরু হয় দেলওয়ারের ভাসমান জীবন। মেয়ের নাম রাখে তার খুন হয়ে যাওয়া মায়ের নামে। একসময় সে স্থায়ী হয় এই নতুন অজানা অচেনা শহরে। মেয়েকে বড় করে তোলে নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে। পূরণ করে মেয়ের সব আবদার। মায়ের অভাব কখনো বুঝতে দেয় না তাকে। তবে একসময় তাদের এই ছন্দময় জীবনে ওঠে ছন্দপতনের ঢেউ। মেয়ের আবদার রক্ষার্থে প্রযুক্তির ছাপ এনে দেয় দেলওয়ার। বদলে যায় মেয়ের জীবনাচারণ। চিরচেনা সেই মেয়ে হঠাৎ করেই যেন অচেনা আর দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে দেলওয়ারের কাছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড় করে যেন ভেঙে পড়তে শুরু করে মেয়েকে নিয়ে দেলওয়ারের এতদিনের সকল স্বপ্ন, আশা এবং প্রত্যাশা। শুরু হয় আরেক অসম প্রেমের রূপরেখা। সমাজ সংসার সকল বাঁধাকে ছিন্ন করে এগিয়ে চলে আলোমতি-দেলওয়ার রূপি আরেক জুটি।

সমাজ তাদের মেনে নেয় না। ঘৃণার বাণে বিদ্ধ করে বাবা-মেয়েকে। তবে এ বাণের আঘাত থেকে পক্ষপাতের মাধ্যমে বেঁচে যায় প্রেমিক। কিন্তু সকল আঘাত পেয়েও এতটুকুও অবদমিত হয় না দেলওয়ারের মেয়ে আলোমতির প্রেম। সমাজের এই নির্মমতা আর অবিচারের জালকে ছিন্ন করে প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের বিশ্বাসকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে। তারা নিজেরাও জানে না তাদের ভবিষ্যত কী? কী ঘটবে তাদের জীবনে। কিন্তু দেলওয়ার তো জানে। সে তো এই নির্মমতার এক নীরব সাক্ষী। তাই হয়তো সে মেনে নিতে পারে না নির্মমতার আরেক দৃশ্যপট। একসময় জাগতিক সকল বাঁধা ছিন্ন করে দেলওয়ার ফিরে চলে স্ত্রী আলোমতির সান্নিধ্যে।

উপন্যাসের পুরোকাহিনি বিবেচনায় মোটা দাঁগে তিনটি বিষয় আমার কাছে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। যথা-
১. প্রযুক্তির উৎকর্ষতা : উপন্যাসের প্রথমাংশে এই প্রযুক্তির ছাপের ফলে আলোমতি-দেলওয়ারের ঠিকানা হয়েছিলো অচেনা এক নির্মম শহরে। আবার শেষে দেলওয়ারের মেয়েরও সেই একই পরিণতি হয় প্রযুক্তির ছোঁয়া পেয়ে।
২. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : এই একবিংশ শতাব্দীর বুকে এসেও আমাদের সমাজে ঘৃণার চোখে দুই ভিন্নধর্মের ভালোবাসা। সমাজে এখনো যেন স্থান নেই তাদের ভালোবাসার। এই ভালোবাসার সামাজিক পরিণতি শুধুই বঞ্চনা এবং দুর্গতি। যেখানে সমাজপতিরাই সর্বেসর্বা।
৩. ধর্মীয় বাঁধা : ভালোবাসা আর ধর্ম, সত্যিই কি একে অপরের বাঁধা! মোটাদাগে মূলত এ বিষয়টাই ফুটে উঠেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। এ প্রশ্নের উত্তর পাঠক নিজেই দিবেন উপন্যাসটি পড়ে। তবে দিনশেষে একটি প্রশ্নই থেকে যায়। তাহলো, সমাজ এবং ধর্মের নামে এই অন্যায় বাঁধা না দিলে কি ভিন্ন হতে পারতো না আলোমতি-দেলওয়ার আর আর তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবন!

উপন্যাস : আলোমতি
লেখক : মোহাম্মদ অংকন
প্রকাশনায় : কবি প্রকাশনী
প্রকাশকাল : ডিসেম্বর-২০২০
মূল্য : ১৮০ টাকা।

 

ads here