আ.লীগে যোগ দিলে যদি সেতু হয় তাতেও রাজি এমপি বাদল

151
  |  শনিবার, আগস্ট ১০, ২০১৯ |  ১:১৪ অপরাহ্ণ
ads here

জাতীয় সংসদে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার বলার পরও কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর উপর সড়কসহ রেলসেতুর নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল। তিনি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাটে সেতু নির্মাণের পরিণতি না দেখলে আসসালামু আলাইকুম বলে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাব। গতকাল শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় একটি ক্লাবে চট্টগ্রামে কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন। জীবন সায়াহ্নে এসে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও যদি জীবদ্দশায় সেতুটি হয় তবে দল বদলেও রাজি বলে জানান তিনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সংসদ সদস্য এবং জাসদের একাংশের কার্যকরী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল নিজেকে ট্রেজারি বেঞ্চের সংসদ সদস্য উল্লেখ করে বলেন, সেতুটির জন্য অনেকবার বলেছি, অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার ‘হেঁডাম’ নেই। করতে পারিনি। সেতুর সামপ্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, কালুরঘাট সেতুর ৭১-৭৯ জায়গায় কর্ণফুলী দেখা যায়। ঘণ্টায় আড়াই মাইল গতিতে ফার্নেস অয়েলবাহী ও কয়েকটি যাত্রীবাহী ট্রেন যায়। ৫০ হাজার লোক এ সেতু দিয়ে হেঁটে পার হন। ২-৩ ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার অসহনীয় কষ্টের জন্য মানুষ আমার মৃত মাকে গালি দেন। আছাড় খেলেও এমপির মাকে গালি দেন। এর থেকে মুক্তি চাই।
তিনি বলেন, আমি অসুস্থ। শরীর আর আগের মতো নেই। জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছি। গত ১০ বছর কম করে হলেও ২০ বার সংসদে সেতুর কথা বলেছি। এখন কালুরঘাট সেতু (রেলসেতু) যে অবস্থায় আছে, সেটার ওপর দিয়ে মাত্র দুই কি তিনটি ট্রেন চলে। দোহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েল যায়। আর একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন যায়, আরেকটা আসে। সেই ট্রেনগুলো মাত্রা আড়াই মাইল বেগে চলে, কখন ব্রিজ ভেঙে পড়বে এই ভয়ে। আমি বলতে চাই, ব্রিজ আর কতটা ভাঙলে নতুন করে বানানো হবে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও এই বিষয়ে কথা হয়েছে উল্লেখ করে বাদল বলেন, গত রমজানে, ২৬ রোজার দিন আমি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। শি ওয়াজ কাইন্ড এনাফ। আমাকে সাথে সাথে ডেকেছেন। তিনি বললেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে আপনি কেন এসেছেন, আপনি কী চান? আমি বললাম, আপনার কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই, শুধু ব্রিজটা করে দিলে হবে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, এটার জন্য তো আপনাকে আসতে হয় না। এমনি বললে তো হতো। আপনার ব্রিজ আমি করে দেব। কিন্তু এরপরও হচ্ছে না।
চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেললাইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বারবার বলছি, কালুরঘাটে সড়কসহ রেলসেতু না করলে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন বানিয়ে কোনো লাভ হবে না। ট্রেন কি বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী পর্যন্ত আসার পর লাফ দিয়ে শহরে যাবে? ট্রেন যেতে না পারলে সেই রেললাইন বানিয়ে লাভ কী? সবার আগে দরকার ছিল কালুরঘাট সেতু। সেটি বানানোর পর আস্তে আস্তে রেললাইন এগিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। ওই রেললাইনে বড় বড় নির্মাণ সামগ্রী যেতে পারত। অনেক কম খরচে বহু ইকুইপমেন্ট রেললাইনে পরিবহন করতে পারত। অথচ এখন হচ্ছে পুরোই উল্টো। প্রথমে বানাচ্ছে রেলস্টেশন, তারপর রেললাইন। আর কালুরঘাট সেতুর কোনো খবর নেই।
তিনি বলেন, কক্সবাজারে ঝিনুক মার্কা আন্তর্জাতিকমানের রেলস্টেশন করা হচ্ছে। আমি এর বিপক্ষে নই। যদি কালুরঘাট সেতু না হয় তাহলে ঝিনুক ভেঙে মুক্তা বেরিয়ে যাবে।
সাংসদ বাদল বলেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে হাজার হাজার ব্রিজ হয়েছে। বড় বড় ব্রিজ হয়েছে। পদ্মায় দ্বিতীয় ব্রিজের কথাও আলোচনা হচ্ছে। সারা দিনে তিনটা গরুর গাড়িও চলে না, এমন ব্রিজও হয়েছে। অথচ কালুরঘাট সেতুর ওপর দিয়ে দিনে ৫০ হাজার মানুষ শহরে আসে আর ৫০ হাজার মানুষ যায়, গাড়ির কথা বাদ দিলাম। প্রধানমন্ত্রীকে করজোড়ে বলেছি, প্রতিদিন ৫০ হাজার মানুষ আমার মাকে গালি দেয়। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি ব্রিজটা করে দিন। কিন্তু হয়নি। আমি আর কী করতে পারি? কার কাছে যেতে পারি?
তিনি বলেন, এ সেতু নিয়ে চারবার সমীক্ষা হয়েছে। কোরিয়ান কোম্পানি চূড়ান্ত সমীক্ষা করেছে। রেলওয়ের ধারণা, ৮০০ কোটি টাকা লাগবে। কোরিয়ানরা বলেছিল ১২০০ কোটি টাকা লাগবে। তারা ৮০০ কোটি টাকা দিতে রাজি হয়। সরকারকে দিতে হবে ৩৭৯ কোটি। এত হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন হচ্ছে, অথচ ৩৯০ কোটি টাকার জন্য একটি সেতু পাচ্ছে না চট্টগ্রামবাসী। এটি কি চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ নয়?
চট্টগ্রামের বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে মহাজোটের সংসদ সদস্য মইন উদ্দিন খান বাদল আরো বলেন, ঢাকা দুই ভাগ হওয়ার পর চট্টগ্রামই দেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন। ঢাকার দুই মেয়রকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিলেন। নারায়ণগঞ্জের মেয়রকে দিলেন। রাজশাহীর মেয়রকেও দিলেন। কিন্তু চট্টগ্রামের মেয়রকে এডিশনাল সেক্রেটারির মর্যাদায় ফেলে রাখলেন। চট্টগ্রামের মেয়রকে মন্ত্রীর স্ট্যাটাস দেওয়া হলো না কেন? যদি ভালো না লাগে বাদ করে দিতে পারেন। কিন্তু এসব করা ঠিক নয়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, মানুষ একদিন কিন্তু এসব প্রশ্ন তুলবে। মানুষের মুখ এক, দুই, তিন দিন বন্ধ থাকবে, চতুর্থ দিন কিন্তু মুখ খুলবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম খুবই স্পর্শকাতর এলাকা। এটিকে কুড়িগ্রাম বা ভুরঙ্গমারি ভাবলে ঠিক হবে না। কর্ণফুলী টানেল প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি টানেলের বিরোধী নই। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। কিন্তু কালুরঘাট সেতু থেকে কর্ণফুলী টানেলের দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার। চান্দগাঁও-মোহরার মানুষ কি ৩৯ কিলোমিটার ঘুরে বোয়ালখালী-পটিয়া যাবে? টেমস নদীতে যদি ৩০-৪০টা ব্রিজ থাকতে পারে, কর্ণফুলী নদীর ওপর আরেকটা ব্রিজ বানালে ক্ষতি কোথায়? দায়দায়িত্ব মাথায় রেখে বলতে চাই, ১০ বছরে বহুবার বলেছি, চট্টগ্রামের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ হচ্ছে। রাষ্ট্রের বিনিয়োগে মাথায় রাখতে হবে প্রায়োরিটি ও কস্ট বেনিফিট। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের জন্য কর্ণফুলী, শক্সখ, মাতামুহুরী, বাঁকখালীতে সেতু লাগবে।
কালুরঘাট সেতু সবচেয়ে বড় সামরিক প্রয়োজনীয়তা মেটাবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সেতু মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ হাবকে সংযুক্ত করবে। কক্সবাজারকে সংযুক্ত করবে। শিল্পায়ন, আবাসন এবং পর্যটনের দুয়ার খুলে দেবে।
পায়রা নদীতে বন্দর বানানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পায়রায় বন্দর বানানো হলো। অথচ এই বন্দরে নাকি জাহাজ ঢুকতে পারে না। ক্রমাগত ড্রেজিং করতে হবে। তা-ও ৩০ মাইল এলাকাজুড়ে। তাহলে এই বন্দর কেন বানানো হলো? চট্টগ্রাম বন্দর থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ কি এটা নিয়ে কথা বলতে পারব না? আবার এখন বলছেন, বে-টার্মিনাল হলে ত্রিশ বছর দেশের চাহিদা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। ত্রিশ বছর বাদ দিন। পনের বছরও যদি হয় তাহলে তা আগে বলেননি কেন? কেন বন্দরের টাকা নিয়ে পায়রাতে নষ্ট করা হলো?
তিনি বলেন, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হচ্ছে। আর পাবনায় সমান উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হচ্ছে এক লক্ষ কোটি টাকায়। মানুষ কি একদিন প্রশ্নগুলো করবে না? কেন একই বিদ্যুৎ উৎপাদনে এত বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হলো?
বাদল বলেন, ফ্লাইওভার করছেন সবার বাধা উপেক্ষা করে। চট্টগ্রাম পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য, যেখানে ফ্লাইওভারের নিচেও পানি, উপরেও পানি থাকে। তিনি বলেন, গবেষণা বলছে, ৪১ বছর পর চট্টগ্রাম পানির নিচে ডুবে যাবে। এর নমুনা এখন দেখছি। চট্টগ্রাম-৮ আসনের শহরাঞ্চলে জোয়ারের পানি ঢোকে। জোয়ার কবে আসবে জেনে বিমানবন্দরে যেতে হবে। জলাবদ্ধতার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির প্রতিষ্ঠানকে দিলেন না কেন? এই প্রশ্ন একদিন আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শুরুতে রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। মমতা দেখানো হয়েছে। এখন কাফফারা দিতে হচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষকে। রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে। ভৌগলিক মানচিত্র, সংস্কৃতি পরিবর্তন করে ফেলছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যা করতে হয় তা মিয়ানমারের মধ্যেই করতে হবে। ওখানে তাদের জন্য সেফজোন করতে হবে। কসোভো, গাজার মতো সেফজোন প্রতিষ্ঠা না করে তাদেরকে এখানে রাখা হলে তারা আরো বড় বিপর্যয় তৈরি করবে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি আলহাজ্ব আলী আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, সিনিয়র সাংবাদিক এম নাসিরুল হক, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ফারুক ইকবাল, হাসান আকবর, মুস্তফা নঈম, কামাল পারভেজ, শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, অনিন্দ্য টিটো প্রমুখ।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে আলী আব্বাস বলেন, কালুরঘাট সড়ক কাম রেলসেতু হবে। চট্টগ্রামের সব সংসদ সদস্য ও মেয়রকে নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা করেন। আপনি পারবেন। আপনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশের শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান। যে নেত্রী আপনাকে সম্মান দিয়েছেন, তিনি সেতুও দেবেন।

ads here

চস/আজহার

ads here