কার সাজা খাটে কে

74
 অনলাইন ডেস্ক |  মঙ্গলবার, মার্চ ২৩, ২০২১ |  ৬:১০ অপরাহ্ণ
কার সাজা খাটে কে
ads here
নামমাত্র টাকার লোভে আসামি না হয়েও হত্যা মামলায় জেল খাটছে ছিন্নমূল এক বিধবা নারী। উদ্দেশ্য পিতৃহীন তিন শিশু সন্তানের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেয়া। প্রায় তিনবছর ধরে হত্যা মামলার সাজাভোগ করছেন মিনু আক্তার। আর প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তার (৩০) কুলসুমী রাজার হালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

প্রকৃত আসামি কুলসুমা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার গোরস্থান মাঝেরপাড়া আহমেদ মিয়া বাড়ির জনৈক আবু মিয়ার মেয়ে। তাঁর স্বামীর নাম ছালে আহমদ।

ads here

কুলসুমা সেজে সাজাভোগকারী মিনুর বাড়ি কুমিল্লার ময়নামতি সাত্তার বাজার এলাকায়। তার স্বামী ঠেলাগাড়ির মাঝি (একাধিক ঠেলাগাড়ির ঠিকাদার) ও ঠেলাগাড়িচালক মো. বাবুল ৫ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর দুগ্ধপোষ্য সন্তানসহ তিন শিশুসন্তান নিয়ে চরম আর্থিক অনটনে পড়েন।

তিন সন্তানের খাবার জোগাতে তিনি ঝি এর কাজ শুরু করেন। এতে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় কিছুদিনের জন্য ভিক্ষাবৃত্তিতেও নেমে পড়েন। মিনুর আর্থিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে মর্জিনা আক্তার নামের এক মহিলা তাকে টাকার লোভ দেখিয়ে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসেন। এরপর আসামি কুলসুমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে সীতাকুন্ডের জঙ্গলসলিমপুর ছিন্নমূল বস্তিতে তার থাকার ব্যবস্থা করেন।

তিন সন্তানের দৈনন্দিন খাবার-দাবার ও এককালীন স্বল্প টাকার জন্য তিনি কুলসুমার ফাঁদে পা বাড়ান। রাজি হয়ে যান যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কুলসুমা সেজে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে। তিনি ২০১৮ সালের ১২ জুন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েদি হিসেবে সাজাভোগ করছেন।

কুলসুমা থাকতেন নগরীর কোতোয়ালীর রহমতগঞ্জ ৮১ নম্বর গলির সাইদ ডাক্তারের ভাড়াবাড়িতে। সেখানে ২০০৭ সালের ৯ জুলাই একটি মোবাইল ফোন নিয়ে কথা কাটাকাকাটি হয় পোশাককর্মী কহিনুর আক্তারের সাথে। এক পর্যায়ে কহিনুরকে শ্বাসরোধে করে হত্যা করেন কুলসুমা। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে ওই বছরের ২৬ অক্টোবর থেকে কারাভোগ করেন।

২০০৯ সালে তিনি জামিন লাভ করেন। হত্যা মামলাটিতে ৪র্থ মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০১৭ সালের নভেম্বরে কুলসুমার যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ডের রায় ঘোষণা করেন। এদিকে, জামিন পেয়ে কুলসুমা পলাতক হয়ে যান। মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য কুলসুমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তিনি এমন কাউকে খুঁজতে থাকেন যিনি তাঁর বদলে সাজা ভোগ করবেন। মর্জিনা নামে জনৈক মহিলার মাধ্যমে মিনু আক্তারকে খুঁজে পান তিনি। কুলসুমা সেজে মিনু কারাগারে যাওয়ার পর কুলসুমা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।

ভাই রুবেলের মুখে সন্তানদের মানবেতর জীবনযাপনের খবর পেয়ে তিনি হতাশ হন। এরপর তিনি ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন তা কারা কর্তৃপক্ষকে জানান ১৮ মার্চ। বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে অবহিত করেন গত রবিবার। মিনুর সহায়তায় এগিয়ে আসেন এডভোকেট গোলাম মওলা মুরাদ। গতকাল তিনি আদালতে মিনুর পক্ষে ফ্রি আইনি সহায়তা (প্রবনো) দেন। এডভোকেট মুরাদ বলেন, মানবিক কারণে আমি মিনুকে আইনি সহায়তা দিচ্ছি। এদিকে, ৪র্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞা এক আদেশে আজ মঙ্গলবার কারাগার থেকে মূল আসামি কুলসুমা আর মিনুর হাজতবাস ও কয়েদির ছবি সম্বলিত বালামসহ কারা কর্তৃপক্ষকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ বলেন, মামলাটির মূলনথি আসামিপক্ষের আপিলে উচ্চ আদালতে রয়েছে। আদালত মিনু আক্তারের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন।

জানতে চাইলে সিনিয়র জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমরা হাজতি ও কয়েদির বালাম পরীক্ষা করেছি। বালামমতে দুইজনের নাম ঠিকানা এক হলেও ছবিতে ভিন্নতা রয়েছে।

আরো পড়ুন: জাল নোটসহ পতেঙ্গায় গ্রেপ্তার ১

মিনু আক্তারের তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে আদালতের বারান্দায় বসে থাকা রুবেলের সাথে কথা হয়। মিনুর ভাই রুবেল মিনুর কুলসুমা হয়ে উঠার নেপথ্যের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। আমি রিকশা চালাই। আমি জানতাম আমার বোনকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে আসামি সাজিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। কারাগারে যাওয়ার মাস তিনেকের মধ্যে তার জামিন নেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। কিন্তু তিন বছরেও আমার বোন বের হয়নি। অপরদিকে, তার সন্তানদের দায়িত্বও নেননি কুলসুমা।

তিনি বলেন, মর্জিনা অর্থের লোভ দেখিয়ে আমার বোনকে কুমিল্লা থেকে শহরে নিয়ে আসেন। কিন্তু মর্জিনা, কুলসুমারা কোথায় থাকেন রুবেলের তা জানা নেই বলে উল্লেখ করেন রুবেল। মিনুর দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে ইমন (১২) ও ছোট ছেলে গোলাপ (৬) একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে।

সূত্র: পূর্বকোণ

চস/স

ads here