চাকরির পরীক্ষায় প্রবেশসীমা ৩২ করা সময়ের দাবি

71
 মু, সায়েম আহমাদ |  বৃহস্পতিবার, জুন ১৭, ২০২১ |  ২:৩৬ অপরাহ্ণ
ads here
কোভিড-১৯ বা বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর সবকিছু থমকে গেছে। পালাক্রমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ও আগের মতো কোন রূপ নেই। পৃথিবীর সবকিছু রয়েছে নিস্তব্ধ, অচলাবস্থায়। বাংলাদেশেও এই ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখনো বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিপর্যস্ত। ঠিক তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে চাকরি প্রত্যাশীদেরও বেহাল দশা। যারা পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু এই করোনা নামক ভাইরাসের ভয়াল থাবায় সেই স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছে। করোনায় শিক্ষার্থীদের প্রায় দুই বছর সময় জীবন থেকে নষ্ট হতে চলছে। করোনা ভাইরাসের চলাকালীন সময়ে অনেকের চাকরির আবেদনের বয়সসীমা শেষ হয়ে গেছে। আবার অনেকেরই কাছাকাছি বয়স। এমন পরিস্থিতিতে চাকরি প্রত্যাশীদের যেন প্রতি মুহূর্তে দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে। একদিকে যেমন করোনা ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তা আবার অন্যদিকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শেষ হওয়ায় দুশ্চিন্তা।

আমাদের দেশে বর্তমানে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে যখন গড় আয়ু ছিল ৫৫ বছর তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ আর অবসরের বয়স ছিল ৫৭ বছর। ১৯৯১ সালে সেশনজটের পরিস্থিতি বিবেচনা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২৭ এর পরিবর্তে করা হলো ৩০ বছর। আর তখন ১৯৯১ সালে গড় আয়ু ছিল ৫৭ বছর। এরপর ২০১১ সালে এসে অবসরের বয়স বেড়ে হয় ৫৯ আর মহান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয় ৬০। অবসরের এই ২-৩ বছর বাড়ার কারণে এই সময় তেমন চাকরির বিজ্ঞপ্তিও হয়নি। ১৯৯১ থেকে ২০২১ এই ৩০ বছরে গড় আয়ু ১৬ বছর বেড়ে ৭৩ বছর হয়েছে। কিন্তু চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়েনি। ঠিক আগের অবস্থানে বহাল রয়েছে। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়। আর সেটি হচ্ছে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কারণ চিকিৎসকদের শিক্ষাজীবন বেশি দিনের হওয়ার কারণে তাঁদের আবেদনের বয়সসীমা ৩২ বছর করা হয়েছে। কোটায় আওতাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্যও চাকরির বয়সসীমাও ৩২ বছর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্মান কোর্স তিন বছরের স্থলে চার বছর করা হলেও চাকরিতে আবেদনের প্রবেশকালীন সময় বৃদ্ধি করা হয়নি। তাহলে কি এমন পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা বৈষম্যের শিকার বলতে পারিনা? প্রশ্ন থেকে যায়।

ads here

আরও পড়ুন:- ভাল কাজের বার্তা প্রচার মানুষকে অনুপ্রাণিত করে

এছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক লেখাপড়ার সঙ্গে চাকরির প্রস্তুতিমূলক লেখাপড়ার কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। আমরা যদি একটু পর্যালোচনা করে বলি তাহলে দেখা যাবে, ইতিহাস বিভাগ থেকে পাস করে ব্যাংক কর্মকর্তা, আবার প্রকৌশলী হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হচ্ছেন অনেকেই। চাকরির প্রস্তুতির জন্য যে লেখাপড়া করতে হয়। তার জন্য অবশ্যই আলাদা করে প্রস্তুতিমূলক সময়ের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে যদি কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক লেখাপড়া মনোযোগ দিয়ে করেন, তাহলে তিনি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো সময়ই পান না। তাহলে এসব বিষয়গুলো বিবেচনা করে চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না সেটা নিয়েও প্রশ্ন।

আমাদের দেশে এমনিতেও বেকারত্বের হার অনেক বেশি। একটি দেশের জন্য বেকারত্ব হচ্ছে হুমকিস্বরূপ বা অভিশাপ। কারণ এই বেকারত্ব দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বা সার্বিক উন্নয়নের পথে ধাবিত হওয়ার জন্য বড় একটি বাধা। দেশে বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে অবিরত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেকার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১১ দশমিক ২ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এই হার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষিতদের মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর তথ্য মতে গত আট বছরে তরুণ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। শতকরা হিসাবে যা ১৩ শতাংশ। আর উচ্চ শিক্ষিতের মধ্যে বেকার ১০.৭ শতাংশ। যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮ টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয়। বিবিএস এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ কিন্তু কাজ করেন ৬ কোটি ০৮ লক্ষ। অর্থাৎ বেকার ২৭ লক্ষের ও অধিক। যার মধ্যে শিক্ষিত তরুণ বেকারের সংখ্যাই বেশি। আর শিক্ষিত বেকার হওয়ার পিছনে একটি কারণ হচ্ছে চাকরির বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়া।

আমরা যদি অন্যান্য দেশগুলোর চাকরির প্রবেশের বয়সসীমা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে আমাদের দেশের চাকরির বয়সসীমা ৩০ বছরের থেকে তাদের প্রবেশসীমা উর্ধ্বে। বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে ১৫৫টি দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৫৫ বছর। আবার কোথাও কোথাও ৫৯ বছর পর্যন্ত। উত্তর আমেরিকাতে ৫৯ বছরেও একজন নাগরিক সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়াতে সরকারি চাকরি প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪৫। এছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও চাকরির ক্ষেত্রে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর। পৃথিবীর যত উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে, প্রত্যেক রাষ্ট্র্র বা দেশে চাকরির বয়সসীমা ৩০ ঊর্ধ্বে হওয়ার কারণেই তারা এত উন্নত। তাহলে অন্যান্য দেশগুলোর থেকে আমরা কেন চাকরির বয়সসীমার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকব? আমাদের দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ এর উর্দ্ধে করার জন্য বিভিন্ন সংগঠনসহ চাকরি প্রত্যাশীরা আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বরং শুধু মাত্র আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। তাই চাকরি প্রত্যাশীদের দাবি, করোনাকালীন সরকারের সব প্রণোদনার পাশাপাশি মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছরে আমরা বেকার যুবকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রণোদনা স্বরূপ’ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা স্থায়ীভাবে ৩২ বছর করার জন্য দাবি জানাই। সুতরাং, আমরা চাই কেবল করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের কথা না ভেবে, বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি যেন বৈষম্যহীন ও সর্বজনীন হয়। বেকারত্ব হ্রাস করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং পাশাপাশি কর্ম সংস্থান তৈরি করতে হবে। এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাকরির প্রবেশের বয়সসীমা দিক বিবেচনা করে, বাংলাদেশেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়়সসীমা বাড়ানো উচিত। এতে চাকরি প্রত্যাশীরা নিজ কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার ফলে দেশ উন্নতির শিখরে দুর্বার গতিতে পৌঁছাতে পারবে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। নয়তো শিক্ষার মান উন্নয়নের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়বে। তাই জাতীয় স্বার্থে, বেকার মুক্ত দেশ গড়তে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মেধাকে মূল্যায়ন করতে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

মু, সায়েম আহমাদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ ।

ads here