সোনাইছড়ি ঝরনা দেখতে পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ

219
 আজহার মাহমুদ |  মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০২১ |  ১:৪৫ অপরাহ্ণ

ভ্রমণ করতে যারা ভালোবাসেন তারা সব সময় অপেক্ষা করেন ছুটির দিনের জন্য। ছুটির দিন মানেই ঘুরতে যাওয়া। ঠিক তেমনই এক ছুটির দিনে সোনাইছড়ি ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম বন্ধুরা মিলে।

ads here

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাশেই সোনাইছড়ি ঝরনা। এই ভ্রমণে সঙ্গী হতে নোয়াখালী থেকে ২ বন্ধু ও এক বড় ভাই এলেন। আর চট্টগ্রামে আমরা তিন বন্ধু তো আছিই।
মোট ৬ জনের এই গ্রুপটি সকাল ৮টায় চট্টগ্রামের একেখান থেকে রওনা দিলাম হাদি ফকিরহাটের উদ্দেশ্যে।

হাদি ফকিরহাট জায়গাটি মিরসরাইয়ের একটু আগেই। আরও সহজ করে বলতে গেলে নিজামপুর কলেজের পাশে। চট্টগ্রাম নগরীর একেখান থেকে ঢাকা-কুমিল্লাগামী বাসে উঠে হাদি ফকিরহাট বললেই নামিয়ে দিবে। জনপ্রতি ভাড়া ৫০/৬০ টাকা করে নিবে।

যাই হোক বাসে উঠলাম, প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছালাম নির্দিষ্ট স্থানে। অর্থাৎ হাদি ফকিরহাটে। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পার হয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দিবে ঝরনার রাস্তাটি। সেখানেই পেয়ে যাবেন টমটম, সিএনজি ও রিকশা।

আমরা অবশ্য যাওয়ার সময় হেঁটে গিয়েছিলাম, আসার সময় সিএনজি করে এসেছিলাম। মূলত ঝরনায় যাওয়ার পথ শুরু হয় ওই রাস্তার শেষ দিকে পাহাড়ে ওঠার মাধ্যমে। পাহাড়ের কাছে যাওয়ার আগেই দেখা পাবেন স্থানীয়দের। তাদের ঘরবাড়িও নজর কাড়বে।

সেখানকার যুবক ও বৃদ্ধ অনেকেই গাইড হয়ে পর্যটকদের সঙ্গে যায়। যেহেতু ঝরনাটিতে পৌঁছাতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয় ও পথগুলোও আঁকাবাকা তাই প্রথমবার গাইড নেওয়া উচিৎ। আমরাও গাইড নিলাম একজন। তারপর সেখানকার জয়নাল মামার দোকানে খাবারের অর্ডার করলাম।

জয়নাল মামার দোকানটি এখানে খুবই জনপ্রিয়। যারাই সোনাইছড়ি ঝরনা দেখতে আসেন এখানেই খাবার অর্ডার দিয়ে যান। মূলত অর্ডার পাওয়ার পরই তারা রান্না করেন। মুরগি, আলু ভর্তা ও ডাল এই ৩ আইটেম দিয়েই যতটুকু সম্ভব ভাত খেতে পারবেন। খাবারের দাম ১৩০ টাকা করে জনপ্রতি।

খাবার অর্ডার দিয়ে আমাদের গাইড আলমগীর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঝরনার পথে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ের আঁকাবাকা পথ ও প্রচণ্ড গরম আমাদের কিছুটা ক্লান্ত করেছে। তবে অল্প যাওয়ার পর দেখা পেলাম ঝরনায় যাওয়ার আসল রাস্তা। বড় বড় পাথর আর পানি তো আছেই। সঙ্গে আছে বিশাল বিশাল পাহাড়ের খাদ।

ভয়ংকর কিন্তু অসম্ভব সুন্দর। দুপাশে পাহাড় আর মাঝখানে সরু রাস্তা।কখনো বড় বড় পাথর পাড়ি দিতে হবে, আবার কখনো ছোট ছোট পানির গর্ত পাড়ি দিতে হবে। এরপর আবার পাহাড়েও উঠতে হবে। এরমাঝেই প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছি।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মিলবে এই পথে যাওয়ার সময়। তবে ঝরনায় যাওয়ার এই রাস্তার প্রতিটি অংশই অদ্ভুত সুন্দর। যেন সবখানেই দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য আদর্শ জায়গা। এভাবেই একসময় গাইডকে অনুসরণ করতে করতে আমরা পৌঁছে গেলাম ঝরনার কাছে।

এই ঝরনা দেখার চেয়ে চারপাশের প্রকৃতি দেখার আনন্দটাই বেশি। গ্রীষ্মকাল বলে ঝরনার পানি খুব কম। তবে পানি স্পর্শ করতেই শরীর জুড়িয়ে যায়। সূর্যের এই তাপের মাঝেও একটুখানি প্রশান্তি পাওয়া যায় এই ঠান্ডা পানিগুলো দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলে। ঝরনার পানি পানও করা যায়।

এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক সুন্দর স্থান যেমন দেখেছি তেমন ছবিও তুলেছি। স্মৃতি ধরে রাখতে কে না চায়! ঝরনার কাছে এসে দেখলাম এখানে প্রায় ৪০/৫০ জন পর্যটক বিভিন্ন দলের সঙ্গে এসেছে। ২০ জনের এক গ্রুপ নাকি এই গহীন পাহাড়ের খাদে ঝরনার পাশে রাত্রীযাপনও করেছেন।

যাই হোক ঝরনার পানি পান করলাম, ছবি তুললাম, নাস্তা করলাম ও হালকা বিশ্রাম নিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় ঝরনার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করে রওনা দিলাম। আমরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছি তখন একদল রওনা দিচ্ছে। আমরা যেদিক দিয়ে এসেছিলাম সেদিক দিয়ে যাচ্ছে।

তবে আমরা ফিরলাম ভিন্ন পথ ধরে। এই ভিন্ন পথে যাওয়ার কারণ হলো সহজ রাস্ত। আর এই সহজ রাস্তাটা গাইড থাকার কারণেই চেনা। ঝরনার পাশেই পাহাড়ে বেয়ে উপরে উঠতে হবে। এরপর অল্প হেঁটেই পাহাড় দিয়ে শুধু নামে গেলেই চলবে।

মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা নেমে গেলাম। তখনই বুঝলাম গাইড কেন প্রয়োজন। গাইড না থাকলে এমন সহজ পথ আছে কেউ জানত না। তবে পাহাড় বেয়ে ওঠা যেমন কষ্ট নামাও তেমন কষ্টকর। এটা সোনাইছড়ি ঝরনা ভ্রমণে না আসলে বুঝতে পারতাম না।

পুরো ভ্রমণের সার্থকতা খুঁজতে চাইলে প্রথমেই বলতে হবে ট্রেকিংয়ের কথা। বড় বড় পাথর আর পাহাড়ের গহীনে যাওয়াটা সহজ বিষয় না। এ ছাড়াও পরিবেশ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার স্বাদ তো পাবেনই। তবে ঝরনার কাছাকাছি চলে দূর হয়ে যাবে আপনার সব ক্লান্তি।

আরও পড়ুন:- খৈয়াছড়া ঝরনায় পাবেন প্রকৃতির সৌন্দর্য

কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যে কোনো বাসে উঠে হাদি ফকিরহাট বাজারে নেমে যেতে হবে। ট্রেনে করে আসলেও সীতাকুন্ড নেমে হাদি ফকিরহাট আসা যায়। সেখান থেকে হাদি ফকিরহাট জামে মসজিদ এর গলি ধরে হেঁটে অথবা সিএনজি নিয়ে বড় পাথর যেতে হবে।

সেখান থেকেই শুরু করবেন ট্রেকিং। হাদি ফকিরহাট গ্রাম শেষে পাহাড়ের শুরু থেকে সোনাইছড়ি ঝরনা পর্যন্ত যেতে সময় লাগতে পারে ৩-৫ ঘণ্টা। অনেকে আবার সেখানে রাতে ক্যাম্প করেও থাকে। চট্টগ্রামের একেখান থেকে হাদি ফকির হাট আসতে পারবেন বাসযোগে।

কোথায় থাকবেন?
এই ভ্রমণ একদিনের তাই থাকার দরকার পড়বে না তবুও নিতান্তই রাতে থাকতে চাইলে মীরসরাই বা সীতাকুন্ডে হোটেল পাবেন। ভালো হোটেলে থাকতে চাইলে চট্টগ্রাম চলে যেতে হবে। এ ছাড়াও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় হলে সেখানে রাতে ক্যাম্প করেও থাকতে পারেন।

খাবেন কোথায়?
সোনাইছড়ি ট্রাকিংয়ে যাওয়ার শুরুর পথেই দেখা মিলবে জয়নাল মামার দোকান। ওই এলাকার পরিচিত এই দোকানে ঘরোয়া পরিবেশে খাবার পরিবেশন করা হয়।
ট্রাকিংয়ে যাওয়ার আগেই অর্ডার দিয়ে গেলে ঘুরাঘুরি শেষ করে এলেই খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। এছাড়াও মিরসরাই, সীতাকুন্ডে ভালো মানের রেস্তোরা রয়েছে।

 

 

 

 

 

চস/আজহার

ads here