মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : ৬ মাসে ৩৩৬ জন নিহত

21
  |  মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০২১ |  ১:২৪ অপরাহ্ণ

বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল এখন অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। ব্যক্তিগত প্রয়োজন ছাড়াও বর্তমানে বাহনটিকে জীবিকার অবলম্বন হিসেবেও নিয়েছেন অনেকে। তবে বর্তমান সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন তরুণরা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে।

ads here

এর পেছনে রয়েছে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৪৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ৪৭৮টি। ৬ মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০৫ জন। এর মধ্যে ২২৪ জনের হেলমেট ছিল না। ২৩৯ জনের হেলমেট ছিল। আর মোটরসাইকেল ভিকটিমদের বেশিরভাগই তরুণ, যাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা পেছনে কতগুলো কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো- অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা, বারবার লেন পরিবর্তন করা, ট্রাফিক আইন না মানা, চলন্ত অবস্থায় মুঠোফোনে কথা বলা, হেমলেট ব্যবহার না করা কিংবা নিম্নমানের হেমলেট ব্যবহার করায় সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বাড়ছে।

মোটরসাইকেল বেপরোয়া গতিতে চালানোর ফলে চালক নিজেকেই ঝুঁকিতে ফেলছেন তা নয়, বরং পথযাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সাত মসজিদ সড়কের ধানমণ্ডি জিগাতলার ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলেন। সেসময় ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার শিকার হন। তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমি ফুটপাত দিয়েই হাঁটছিলাম। এমন সময় একটি বেপরোয়া মোটরসাইকেল পেছন থেকে ধাক্কা দিলে পড়ে গিয়ে হাত পায়ে জখম হয়। হাত ও ফ্যাক্চার হয়।

সরেজমিনে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখানে চিকিৎসা নেন। তাদের বেশিরভাগ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। কেউ চালক, কেউ আরোহী এবং কেউ পথচারী।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসনের (নিটোর) কর্মকর্তা তুহিন আহমেদ বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রতিদিন শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগী বেশি আসে। সম্প্রতি রাইড শেয়ারিংয়ে থাকা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যাও বাড়ছে।

এর আগে গত ৮ নভেম্বর টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ৯ম শ্রেণির তিন ছাত্র মোটরসাইকেলে আনন্দ ভ্রমণে বের হয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হন। গত ১২ নভেম্বর একই জেলার ভূঞাপুরে আরো তিন কিশোর প্রাণ হারায় নতুন কেনা মোটরসাইকেলে ভ্রমণে বের হয়ে।

এর আগে বুধবার রাতে বন্ধুর সঙ্গে দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন নিরব হাসান। নিরব জানান, বন্ধুরা মিলে বেশি গতিতে মাওয়া যাচ্ছিলাম। এসময় সড়কে কোনো পিচ্ছিল জিনিসের কারণে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

গত শনিবার (৪ ডিসেম্বর) রাত ১২টার দিকে বিমানবন্দর থানা এলাকার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আউটগোয়িং রাস্তার উপর একটি লরি বেপরোয়াভাবে ড্রাইভিং করার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোটরসাইকেল আরোহী মো. মাহদী হাসান লিমন নিহত হন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৯ লাখ টাকার নিবন্ধিত যানবাহন আছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩১ লাখের বেশি। যা মোট যানবাহনের ৬৮ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ৮ লাখের মতো। এর বাইরে একটি বড় অংশের মোটরসাইকেল অনিবন্ধিত। বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ নতুন মোটরসাইকেল বিক্রি হয়।

শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও দূরদূরান্তে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে মোটরসাইকেল। যানজট, কম মূল্যসহ বিভিন্ন কারণে এর চাহিদা তুঙ্গে। তা ছাড়া দেশেও এখন এই যানবাহনটি তৈরি হওয়ায় বর্তমানে এটা সুলভ মূল্য কিস্তিতেও কেনা যাচ্ছে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল ও দেশে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক মোটরসাইকেল-সংস্কৃতি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার মূল কারণ। তার এ কথার সূত্র ধরে বলা যায়, ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছে মোটরসাইকেল বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেল চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানাতে হবে। সবচেয়ে যা জরুরি তা হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং।

বুয়েটের সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্যমতে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশ ঘটে মফস্বাল এলাকায়, তাই সেখানে ট্রাফিক তদারকি বাড়ানো দরকার। নিয়ন্ত্রণ করা দরকার মোটরসাইকেলের সিসি। কিশোর-তরুণ মোটরসাইকেল চালকদের বিভিন্ন বাইকার্স গ্রুপ আছে। সেখানেও তদারকি বাড়ানো যেতে পারে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করাও বাঞ্ছনীয়।

এবিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার শিকারের ৭০ ভাগই পথচারী। অন্যদিকে, মোটরসাইকেল ভিকটিমদের বেশিরভাগই তরুণ, যাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তারা দেশের উৎপাদনক্ষম জনশক্তি।

হেলমটে পড়ার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, গত ৬ মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে ২৩৯ জনের হেলমেট ছিল। আহত হয়েছেন ৩০৫ জন, এর মধ্যে ২২৪ জনের হেলমেট ছিল না। এটা হল হেলমেট থাকা না থাকার একটা দিক। অন্যদিক হল হেলমেটের কোয়ালিটি।

আইজিপি বলেন, আমাদের দেশে হেলমেটের কোনো সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ নেই। মোটরসাইকেল ও সাইকেলচালকদের মানসম্পন্ন হেলমেট ছাড়া রাস্তায় বের না হওয়ার আহবান জানান তিনি। নিম্নমানের হেলমেট আমদানি বন্ধেরও দাবি জানান।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে ব্যক্তি সচেতনতাই মুখ্য। মনে রাখতে হবে, মোটরসাইকেল বেপরোয়া গতিতে চালানোর ফলে চালক কেবল নিজেকেই ঝুঁকিতে ফেলছেন না; একইসঙ্গে পথযাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জীবনের নিরাপত্তা সবার আগে। তাই মোটরসাইকেল চালানোর সময় সর্তক থাকতে হবে।

পাশাপাশি প্রশাসনকেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ট্রাফিক আইন যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি মোটরসাইকেল যেন নিবন্ধিত হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ১৮ বছরের নিচে কেউ যাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স না পায়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

চস/আজহার

ads here