করোনা সন্দেহে আইসিইউ থেকে নামিয়ে দেয়ায় মৃত্যু

255
  |  শনিবার, এপ্রিল ৪, ২০২০ |  ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
করোনা সন্দেহে আইসিইউ থেকে নামিয়ে দেয়ায় মৃত্যু
ads here
জ্বর ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত সীতাকুণ্ডের এক বৃদ্ধাকে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে আইসিইউ থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে দিয়েছে নগরীর মেহেদীবাদস্থ ন্যাশনাল হাসপাতালের পরিচালক। এসময় বৃদ্ধার স্বজনদের করুন আকুতিও ডাক্তারদের মন গলাতে পারেনি। এ ঘটনার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই চিকিৎসার অভাবে বৃদ্ধাটির মৃত্যু হয়। আর মৃত্যুর পরদিন বুধবার ঐ বৃদ্ধার লাশ দাফন শেষে বিকালে ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতাল নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট দিয়ে জানায় তিনি করোনা আক্রান্ত নন।

এ ঘটনার চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে হতভাগ্য পরিবারটিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সীতাকুন্ড পৌরসভার ২নং ওয়ার্ড পন্থিছিলা মৃত মাহমুদুর রহমান চেয়ারম্যান বাড়ির রফিক আহমেদের স্ত্রী মমতাজ জাহান (৬৫) এর জ্বর বেড়ে যাওয়ায় গত শনিবার তাকে সীতাকুন্ড চিকিৎসা দিতে চেয়েও ক্লিনিকগুলোতে কোন ডাক্তার পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে তার স্বামী ও সন্তান নাঈম আহমেদ তাকে মহানগরীর মেহেদীবাদস্থ ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে তাকে ভর্তি করাতে কর্তৃপক্ষ জেরা শুরু করেন। পরিবারের কেউ বিদেশ থেকে এসেছে কিনা, বাড়ির পাশে কেউ এসেছে কিনা? ইত্যাদি জিজ্ঞাসা শেষে তাকে আইসিইউতে নিয়ে ভর্তি করান ডাক্তারা। সেখানে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত চিকিৎসা করে ডাক্তারা বেলা ১১টার দিকে জানান, জ্বরের সাথে শ্বাসকষ্টের কারণে সবাই তাকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত বলে সন্দেহ করছেন। এতে তারা ফৌজদারহাট বিআইটিআইডিতে খবর দিলে বিকাল ৩টার দিকে সেখান থেকে এসে মমজাত জাহানের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ads here

এদিকে বিকাল ৫টার দিকে ন্যাশনাল হাসপাতালের পরিচালক আবু নাসের এসে বৃদ্ধার স্বামী ও ছেলেকে জানায় যে মমতাজ জাহানের করোনা হয়েছে বলে সকল চিকিৎসকরা সন্দেহ করছেন। তাকে আর এখানে রাখলে চিকিৎসকরা আইসিইউতে আসবেন না বলে জানিয়েছে। তাই তাকে আর আইসিইউতে রাখা সম্ভব হবে না। তাকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হবে। এক পর্যায়ে বৃদ্ধার স্বজনদের কোন আকুতি না শুনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পরিচালক বৃদ্ধাকে সাধারণ ওয়ার্ডে নিয়ে আসেন। এখানে আনার পর থেকে মমতাজ জাহানের অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে এবং মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে মৃত্যুর পর হাসপাতালের নার্স থেকে শুরু করে কেউই মৃতদেহ স্পর্শ করেনি। এতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। এরপর ৭৭ হাজার টাকা বিল দাবি করে কর্তৃপক্ষ। শেষে ৬৭ হাজার টাকা পরিশোধ করে লাশ নিয়ে আসা হয় গ্রামের বাড়িতে। গত বুধবার সকালে বৃদ্ধার নিজ বাড়িতে তার লাশ দাফন হয়।

এদিকে একই দিন বিকাল ৩টার দিকে ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি থেকে ফোন করে জানানো হয় বৃদ্ধা মমতাজ জাহানের শরীরে করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এতে তার স্বজনদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এ বৃদ্ধার ছেলে মো. নাঈম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লকডাউনের কারণে কোথাও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মা অসুস্থ হবার পর সীতাকুন্ডে কোন চিকিৎসক না পেয়ে চট্টগ্রামের ন্যাশনাল হাসপাতালে অনেক অনুরোধ করে ভর্তি করাই। সেখানে তারা দুই তিন দিন চিকিৎসা করে হঠাৎই সন্দেহ করতে থাকেন আমার মায়ের করোনা হয়েছে।

আরো পড়ুন: নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় সন্দ্বীপে চার দোকানীসহ ১৭ মোটর সাইকেল চালককে জরিমানা

আর নিছক এই সন্দেহের কারণে মাকে চিকিৎসা না দিয়ে আইসিইউ থেকে জোর করে নামিয়ে দেন হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. আবু নাসের। তাদেরকে অনুরোধ করেছিলাম যেন করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসার পর মাকে নামিয়ে দেওয়া হোক। এমনকি রিপোর্ট দ্রুত প্রদানের জন্য চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের কাছেও অনুরোধ করি । কিন্তু তিনি সেদিন রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। কিন্তু সে পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করতে রাজি হননি। মাকে আইসিইউ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। অনেকটা জোর করে মেরে ফেলার অভিযোগ করেছেন তার ছেলে তায়েম আহমেদও। এদিকে এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে ন্যাশনাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবু নাসেরের ০১৯৭১৫৭৪৬৭৯ নম্বরে অনেক বার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ফজলে রাব্বি বলেন, সেদিন ঐ বৃদ্ধার ছেলেরা রিপোর্টটি দ্রুত দেবার জন্য আমার কাছে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু একটি পরীক্ষার রিপোর্ট দিতে তো ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই দ্রুত দেওয়া যায়নি। তবে এ রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত করোনা সন্দেহ করে চিকিৎসা না করাটা উচিত হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ ধরণের কিছু কিছু অভিযোগ পাচ্ছি। আমরা বারবার বলছি যেন এমনটা না হয়, বিএমএও বলছে কাউকে যেন চিকিৎসা বঞ্চিত করা না হয়। তবুও কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমি এরজন্য মনিটরিং কমিটি গঠন করেছি। একটা ভীতি থেকে অনেক ডাক্তার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আশা করি দ্রুত এটি কেটে যাবে এবং কেউ চিকিৎসা বঞ্চিত হবে না।

চস/সোহাগ

ads here