চট্টগ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক রোগি চীনের আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিতে বিদেশ যেতে চান। কিন্তু চীনের মেডিকেল ট্যুরিজম সেবা ছিল শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক।
চট্টগ্রামবাসীর সেই চাহিদা পুরণে চট্টগ্রামভিত্তিক ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্ম চীনের দুটি হাসপাতালের সাথে ১০ জানুয়ারি এক সমঝােতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
হাসপাতাল দুটি হচ্ছে, শেনঝেন হেংসেন হসপিটাল (Shenzhen Hengshen Hospital) এবং গোয়াংঝু ফোসান চেনচেং হসপিটাল Guangzhou Fosun Chancheng Hospital। এই দুটি হাসপাতালের বিশেষায়িত সেবার সব প্রক্রিয়া চট্টগ্রামে ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্ম থেকেই পাবেন চট্টগ্রামের রােগিরা। চাইলে সেই দুটি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সেবা ভিডিয়ো কল বা টেলিমিডিসিন সেবা নিতে পারবেন।
কিভাবে চট্টগ্রাম থেকেই রোগিরা এই সেবা পাবেন জানতে চাইলে ট্রেফেল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের ম্যানেজার মোহাম্মদ মামুন বলেন, “আগ্রহী রোগিরা নিজেদের প্রেসক্রিপশন ফাইল, ডায়াগনসিস রিপোর্ট আমাদের কাছে জমা দিবেন। আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টীম রোগির সব তথ্য বিশ্লেষন, রোগের ধরণসহ বিস্তারিত অনলাইনে চীনের হাসপাতালে পাঠাবেন। ২৪ ঘন্টার কম সময়ের মধ্যে আমরা চীনা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছ থেকে সেই রোগির একটি ডিটেইলস প্ল্যান পাবো। যেখানে রোগির কোন ধরনের চিকিৎসা করা হবে, ট্রিটমেন্টে কতদিন সময় লাগতে পারে, ট্রিটমেন্টের ধরন কেমন এবং সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে ধারনা থাকবে। এরফলে রোগি নিজ ঘরে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন চিকিৎসা সম্পর্কে।”
তিনি বলেন, এরপর যদি রোগি সিদ্ধান্ত নেন চীন গিয়ে ট্রিটমেন্ট নিবেন তার পরবর্তী ধাপে ভিসা আবেদন, ফাইলিং, ডাক্তার অ্যাপয়েনমেন্ট, রোগির অ্যাটেনডেন্টের ভিসা আবেদন, বিমান টিকেট, চীনের এয়ারপোর্ট থেকে হাসপাতালে পৌঁছা, চীনের হাসপাতালে গাইড, ট্রান্সলেটর, থাকা-খায়া সবকিছুই আমরা সার্ভিস দিয়ে থাকি। ফলে ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্ম এবং ট্রেফেল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস থেকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস পাবেন রোগিরা।’
ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্মের কনসালটেন্ট আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী বলেন, পরবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রচুর রোগি চট্টগ্রাম থেকে চীন যেতে চাইছেন। প্রধানত দুই কারণে রোগিরা চীন যেতে চান একটি হচ্ছে, বিশ্বের লেটেস্ট প্রযুক্তির চিকিৎসা সেবা এবং দ্রুত ভিসা সুবিধা। ফলে থাইল্যান্ডের চেয়ে অন্তত ৪০ কম খরচে চীনের চিকিৎসা সেবা পাবেন রোগিরা। চট্টগ্রাম থেকে আগে এই সেবা ছিল না। এখন সেই সুযোগ খুলে দিল ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্ম। চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ের এরিয়েল লিজেন্ড ভবনের অফিসে এই সেবা চট্টগ্রামবাসীর জন্য শুরু হয়েছে।
এর আগে ১০ জানুয়ারি শেনঝেন হেংসেন হসপিটাল এবং গোয়াংঝু ফোসান চেনচেং হসপিটালের প্রতিনিধিরা জিইসি মোড়ের ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্মের অফিস ভিজিট করেন। সেখানে হাসপাতালের সাথে ট্রেফেলের সমঝোতা স্মারক স্মাক্ষরিত হয়।
গোয়াংঝু ফোসান চেনচেং হসপিটালের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন হসপিটালের ভাইস প্রেসিডেন্ট সং শেংসেং। ট্রেফেলের পক্ষে মােহাম্মদ মামুন। শেনঝেন হেংসেন হসপিটালের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ঝেং ফ্যান আর ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্মের পক্ষে স্বাক্ষর করেন আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী।
দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা একমত হন আগামীতে চট্টগ্রামে চীনা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা আরো বড় পরিসরে করা হবে।
এরপর চীনভিত্তিক বেল্ট এন্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টারে প্রধান নির্বাহী ডাক্তার মারুফ মোল্লাকে স্যুভেনিয়র দেয়া হয় ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্মের পক্ষ থেকে। অনুষ্ঠানে ট্রেফেল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার ইখতিয়ার ইসলাম, শৈবাল দাশ গুপ্ত, এমডি ইমাদে রাব্বানি উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১০ জানুয়ারি চীনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আটজনের একটি দল চট্টগ্রাম আসেন। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বেস্ট ওয়েস্টার্ণ হোটেলে দিনব্যাপি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারি পরামর্শ দেন। চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার জেলা, চট্টগ্রাম জেলা থেকে শতাধিক রোগি চট্টগ্রামে এসে চীনা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ সেবা গ্রহণ করেন।ভাষাগত সমস্যা সমাধানের জন্য আটজন ডাক্তারদের সাথে ছিলেন চীন থেকে এমবিবিএস পাশ করা বাংলাদেশি আটজন ডাক্তার।
দীর্ঘসময় ধরে রোগিদের সমস্যা শোনে পরামর্শ দেয়ার প্রশংসা করেন কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে আসা রোগি মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, আমার সমস্যাগুলো খুব যত্ন সহকারে শুনেন চীনা ডাক্তার। সমস্যা বুঝতে এমনকি আমাকে হাটিয়ে দেখেন মুল সমস্যা কোথায়। এই সেবা পেয়ে আমি খুবই খুশি। ভবিষ্যতে আরো বেশি ডাক্তার নিয়ে বড় ধরনের চিকিৎসা ক্যাম্প করা উচিত।”
চীনে বাংলাদেশিদের মেডিকেল ট্যুরিজম শুরু হয় ২০২৫ সালের মার্চে। এই উদ্যোগের মুল নেপথ্যে ছিলেন বেল্ট এন্ড রোড হেলথকেয়ার সেন্টারে প্রধান নির্বাহী ডাক্তার মারুফ মোল্লা। তার জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সান ইয়েত সেন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে সেখানে ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস করেছেন ডাক্তার মারুফ। একই সাথে তিনি চীনের ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল প্রতিনিধি। বাংলাদেশের রোগীদের আবেগ এবং চীনের উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি বাংলাদেশিদের জন্য নতুন এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। সেটি এখনো চালু আছে।
চস/স


