লিবিয়া থেকে রাবার নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১১ জন যুবকসহ মোট ২২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার পর বিষয়টি জানা যায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার সূত্রে যুবকদের মৃতের বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মারা যাওয়া ২২ যুবকের মধ্যে ১১ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়।
তার মধ্যে রয়েছেন, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০) ও করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তারেক মিয়া (২৩)। দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম। জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী। মারা যাওয়ার পর তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, গত ২১ মার্চ সন্ধ্যায় লিবিয়ার তোবরুক অঞ্চল থেকে একটি রাবার বোটে করে মোট ৪৮ জন যাত্রী গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রাপথে নৌকাটি দিক হারিয়ে ফেলে এবং টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। এ সময় যাত্রীরা খাবার ও পানির তীব্র সংকটে পড়েন।
উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, চরম দুর্ভোগের কারণে অন্তত ২২ জন প্রাণ হারান। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
গ্রিস কোস্টগার্ড সূত্রে জানা যায়, ইয়েরাপেত্রা উপকূল থেকে প্রায় ৫২ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে একটি বিপদগ্রস্ত নৌকার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে একটি ফ্রন্টেক্স জাহাজ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধারপ্রাপ্তদের মধ্যে ২৪ জন পুরুষ, একজন নারী এবং একজন নাবালক রয়েছে। তাদের প্রথমে কালা লিমেনা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে হেরাকলিয়ন বন্দরে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় অসুস্থ দুইজনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
দোয়ারাবাজার উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জামাল উদ্দীন তার ভাগনের আবু ফাহিমের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তার এলাকার দুজনের মৃত্যু বিষয়টি জানিয়েছেন। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম তার ওয়ার্ডেও দুইজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন। পাইলগাঁও গ্রামের মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তার ভাই মারা গেছেন।
নিহতের স্বজনরা জানান, তারা জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে গিয়েছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।’
জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত জগন্নাথপুরের ৫ জনের মৃত্যুর খবর জেনেছি। তথ্যের জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্যদের বলা হয়েছে। পরে জানানো হবে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, এরা তো বৈধ পথে যায়নি তাই এদের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা যোগাযোগ করছি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে, যদি কোনো তথ্য থাকে তাহলে হয়তো ফরমালি আপনাদের জানাতে পারব। আর যেসব খবর আমরা পেয়েছি তাদের বাড়ি বাড়ি আমাদের নির্বাহী কর্মকর্তারা যাচ্ছেন। আমরা জানতে চাইব কাদের কাছে টাকা দিয়েছে, কি উদ্দেশ্যে তারা লেনদেন করেছে। এসব যদি জানা যায় তাহলে এদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করব। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
চস/স


