সংবিধানে বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
রোববার (১৫ মার্চ) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।গত ২০ নভেম্বর ওই রায় দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।
দেশে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলো
শুরুটা হয়েছিল ৯০-এর দশকে বিএনপি ক্ষমতা থাকাকালে। তখন একটি আসনে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ওঠে। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের দাবির মুখে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী হিসেবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই বছর ২৭ মার্চ সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রবর্তন ঘটে।
এ বিধান অনুসরণ করে ১৯৯৬ সালে সপ্তম, ২০০১ সালে অষ্টম এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনগুলো নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও সংবিধানবহির্ভূত উল্লেখ করে আইনজীবী এম সলিমউল্যাহসহ তিন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট করেন। শুনানির পর তিন বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চ ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ওই বছর রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করেন। ২০১০ সালে আপিলে শুনানি শুরু হয়। আপিল শুনানিতে এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে সহায়তাকারী) হিসেবে আটজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর মতামত নেন। বেশিরভাগ আইনজীবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এমনকি সে সময়ের রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।
আপিলের শুনানি শেষে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে রায় দেন। এতে প্রধান বিচারপতিসহ চারজন বাতিলের পক্ষে ছিলেন। ২০১১ সালের ১০ মে দেওয়া রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অর্থাৎ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন অগণতান্ত্রিক এবং তা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিলযোগ্য। তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এই রায় ঘোষণার সাতদিন পর অর্থাৎ ১৭ মে অবসরে যান এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়ার প্রায় ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে। পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে ‘তবে প্রয়োজনের নিরিখে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে’এই পর্যবেক্ষণ বাদ দেওয়া হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া রায়ের পক্ষের বাকী তিন বিচারপতি যথাক্রমে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তবে ভিন্নমত পোষণকারীরা প্রধান বিচারপতি হতে পারেননি। এই রায়ের পর সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রথা বিলোপ করেন।
আর তারপরই তিনটি নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে করে একতরফাভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দ্বাদশ নির্বাচনের ছয় মাস পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতন হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে ২০১১ সালের বিতর্কিত রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত বছর ২৭ আগস্ট আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি। পরে ১৭ অক্টোবর আবেদন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনসহ আরো দুটি আবেদন করা হয়।
রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ আপিলের অনুমতি দেন। ২০ নভেম্বর সে আপিলের ওপর রায় দেন আপিল বিভাগ।
যেমন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া
১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ২ক পরিচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। এই সরকারের মেয়াদ হবে অনধিক ৯০ দিন। প্রধান উপদেষ্টা ও অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। যদি তিনি সম্মত না হন, তবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম যিনি, তিনি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনিও সম্মত না হলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম জন প্রধান উপদেষ্টা হবেন। যদি এই পদ্ধতিগুলো ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে অগ্রসর হবেন।
প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক অনধিক ১০ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করা হতো। যদি কোনো প্রক্রিয়াতেই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হতো, তবে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান ছিল। আর উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতায় বলা ছিল, একজন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে তার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সদস্য হবেন না। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না মর্মে লিখিতভাবে সম্মত হতে হতো। আর প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের বয়স ৭২ বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।
আর সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে। প্রধান উপদেষ্টা যদি রাষ্ট্রপতিকে জানাতেন যে কোনো উপদেষ্টা দায়িত্ব পালনে অক্ষম, তবে রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারবেন।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরমেট
গত ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এর ১৬ ধারায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এবং ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ হিসেবে নতুন করে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে সনদে। সংসদের মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা অন্য যে-কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ফরমেট সম্পর্কে বলা হয়, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ে একটি বাছাই কমিটি রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে এই কমিটি গঠিত হবে। জাতীয় সংসদের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় এটি গঠিত হবে। কমিটি গঠনের ১৪ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য ব্যক্তি বাছাই করতে হবে।
কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে পাঁচজন। এতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) ও সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন স্পিকার। উপদেষ্টাদের বয়সসীমা ৭৫ বছরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
সনদে আরও বলা হয়েছে, এই পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও শর্ত দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে না। যদিও প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা ধরা হয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৫৮গ অনুচ্ছেদ অনুসারে। তবে জুলাই সনদের ৩ ধারা বা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজনে হবে। সূত্র: ঢাকা পোস্ট
চস/স


