spot_img

১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার
৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সর্বশেষ

লোকসংস্কৃতির মেলা, জব্বারের বলী খেলা

বলী খেলা, যা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা। এই খেলায় অংশগ্রহণকারীদেরকে বলা হয় বলী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তি ‘বলী খেলা’ নামে পরিচিত। এটি বাঙালি জাতির এক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত। যা এখনও ঠিকে আছে চট্টগ্রামের আবদুল জব্বারের বলী খেলার মাধ্যমে। প্রতিবছরের ১২ বৈশাখ চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে এই বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয় জাকজমকভাবে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতা জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিতি লাভ করে।

বর্তমানে জব্বারের বলী খেলা একটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যমন্ডিত প্রতিযোগিতা হিসেবে সারাদেশে বিবেচিত। এই বলী খেলাকে কেন্দ্র করে লালদিঘী ময়দানের আশেপাশে প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা।

ভারতবর্ষের স্বাধীন নবাব টিপু সুলতানের পতনের পর এই দেশে বৃটিশ শাসন শুরু হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একইসঙ্গে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বলী খেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন। ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ নিজ নামে লালদীঘির মাঠে এই বলী খেলার সূচনা করেন তিনি।

কীভাবে এলো জব্বারের বলীখেলা

তৎকালীন সময় ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার মিয়াকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামী-দামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন।

চট্টগ্রামের স্থানীয় মুরুব্বিদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বলির দেশ। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থানের উনিশটি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল। প্রচন্ড দৈহিক শক্তির অধিকারী মল্লরা সুঠামদেহী সাহসী পুরুষ এবং তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হচ্ছে শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন বলিখেলার প্রধান আকর্ষণ ও বলি খেলা আয়োজনের মূল প্রেরণা। কিন্তু এখন পেশাদার বলির (কুস্তিগীর) অভাবে বলিখেলার আকর্ষণ অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে পেশাদার বলি পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। এখন আর কেউ বলি কিংবা কুস্তি খেলতে আগ্রহ দেখায় না। আগে গ্রামে গ্রামে এমন কুস্তি আর বলি খেলা হতো। আজ সেই দৃশ্য প্রায় কল্পনার পর্যায়ে চলে গেছে বলেও স্থানীয়রা জানান।

ঐতিহ্য অহংকারের জব্বারের বলীখেলা

করোনার কারণে মাঝখানে এই বলী খেলা দুই বছর বন্ধ ছিলো। একইসাথে বলী খেলাকে কেন্দ্র করে যে মেলা গড়ে উঠে সেটাও বন্ধ ছিলো। এবছর জব্বারের বলী খেলার ১১৫ তম আসর অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবছরেই ঐতিহ্যের এই আসরের দিন ঘনিয়ে এলে চট্টগ্রামের মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ ফুঠে উঠে। শুধু চট্টগ্রামের মানুষই নয়, বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে ছুটে আসে এই বলী খেলা দেখতে।

জব্বারের বলী খেলার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে যেমন কক্সবাজারে ডিসি সাহেবের বলী খেলা, সাতকানিয়ায় মক্কার বলি খেলা, আনোয়ারায় সরকারের বলী খেলা, রাউজানে দোস্ত মোহাম্মদের বলী খেলা, হাটহাজারীতে চুরখাঁর বলী খেলা, চান্দগাঁওতে মৌলভীর বলী খেলা, নগরীর সিআরবিতে সাহাবুদ্দিনের বলী খেলা এখনও কোন রকমে বিদ্যমান। তবে জব্বারের বলী খেলার মতো কোনোটাই নিয়মিত এবং ঐতিহ্যপূর্ণ নয়।

আরও পড়ুন:- ১১৫ তম জব্বারের বলি খেলার ট্রফি ও জার্সি উন্মোচন

জব্বরের বলী খেলার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার শাহজালাল বলী ও রানাসআপ রামুর জীবন বলী। জব্বারের বলী খেলায় এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ চ্যাম্পিয়ন দিদার বলী। তিনি সর্বোচ্চ ১৩ বার বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে দিদার বলী এ খেলা থেকে অবসরে আছেন।

যদিও এই বলী খেলার আয়োজন নিয়ে অনেকের আছে নানান মত। বলী খেলা নিয়মিত দেখতে আসেন চট্টগ্রামের মুরাদপুরের বাসিন্দা নুরুল কবির। তিনি বলেন, যাকে তাকে সুযোগ না দিয়ে প্রকৃত বলীদের খেলায় সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে এ খেলার মান আরও বৃদ্ধি পাবে। এখানে অনেক বলী আসে যাদের খেলা দেখলে বলী খেলার মতোই লাগে না।

কুমিল্লার সুলতানপুর ইউনিয়নে থাকেন মোহাম্মদ রাজু। তিনি জানান, প্রতিবছরই এই মেলার সময় চট্টগ্রাম চলে আসি। এই মেলা ও খেলার প্রতি একটা আলাদা টান আছে। এটাকেই উৎসব উৎসব মনে হয় নিজের কাছে।

অনেকে বলী খেলার পরিবর্তে একে বৈশাখী মেলা হিসেবেও চিনে। জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহংকারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করা হয়। খেলাকে কেন্দ্র করে তিন দিনের আনুষ্ঠানিক মেলা বসার কথা থাকলেও কার্যত পাঁচ-ছয় দিনের মেলা বসে লালদীঘির ময়দানের আশপাশের এলাকা ঘিরে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে মেলায় গিয়ে দেখা গেছে, নগরের আন্দরকিল্লা মোড় থেকে শুরু হয়ে টেরিবাজার সোনালী ব্যাংক মোড় এবং লালদিঘী ময়দান হয়ে কোতোয়ালি থানার মোড় পর্যন্ত এলাকায় মেলা বসেছে। একইসঙ্গে মেলা বসেছে কেসিদে রোডের সিনেমা প্যালেসসহ আশপাশের এলাকায়। মেলায় গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন লোকজ শিল্পের পাশাপাশি দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসেছেন শিশুদের খেলনা, গৃহস্থালি সামগ্রী দা, ছুরি ও বটিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এ ছাড়া মেলায় নানা ধরনের হস্তশিল্প এবং ফল ও ফুলের গাছ নিয়ে পসরা সাজিয়েছে বিক্রেতারা।

স্থানীয়রা জানান, বুধবার থেকে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও বিক্রেতারা আরও কয়েকদিন আগে থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য নিয়ে এসে পসরা সাজাচ্ছেন। এবং মেলার আগেই বেঁচাকেনা শুরু হয়েছে।

বিক্রেতা জানে আলম জানান, গতবছরের তুলনায় এবার বেঁচা বিক্রি বেশি। তার দোকানেও এবার বেশকিছু আকর্ষণীয় পন্য আছে। যার প্রতি ক্রেতার চাহিদাও রয়েছে। প্রতিবছর যা জিনিসপত্র আনেন সবই বিক্রি হয়ে যায়। এবারও তেমন হবে বলে তিনি আশা করেন।

মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী বলেন, এই খেলা ও মেলার আয়োজন শুরুর পর কখনও বন্ধ ছিল না। তবে মাঝখানে দুই বছর করোনা মহামারির কারণে ১১১ ও ১১২তম আসর বাতিল করা হয়। এরপর থেকে পুনরায় প্রতি বছর যথাসময়ে মেলা ও খেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

 

চস/আজহার

 

Latest Posts

spot_imgspot_img

Don't Miss