বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এখন আর শুধু পণ্য রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তারা বিশ্বজুড়ে দক্ষ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের নিজ দেশে টানতে শুরু করেছে। অত্যন্ত সহজ শর্তে এবং কম খরচে চীনে নিজস্ব কোম্পানি খুলে রেসিডেন্ট পারমিট বা দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের সুযোগ পাচ্ছেন বিদেশিরা। থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো দেশের তুলনায় চীনের এই ‘রেসিডেন্ট স্ট্যাটাস’ পাওয়ার প্রক্রিয়া ও ব্যয়—উভয়ই এখন অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
চীন কেন এই সুযোগ দিচ্ছে?
মূলত কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরাসরি চীনা বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে বেইজিং এই নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য চীনের দরজা এখন উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনের ‘ইমিগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ এবং ‘মিনিস্ট্রি অফ কমার্স’ (MOFCOM) বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে যে নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছিল, তার সুফল মূলত ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে গুয়াংঝু (Guangzhou), শেনজেন (Shenzhen) এবং ইয়ু (Yiwu) এর মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোতে এই রেসিডেন্ট পারমিট ইস্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি বিদেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এই বিশেষ কোম্পানি-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় চীনে থাকার অনুমতি পেয়েছেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নাগরিক।
রেসিডেন্ট পারমিটের সুযোগ-সুবিধা
চীনে রেসিডেন্ট পারমিট থাকলে একজন বিদেশি নাগরিক স্থানীয়দের মতোই প্রায় সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
এর মধ্যে রয়েছে:
১. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও লেনদেন: সহজে বিজনেস ও ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা।
২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: সন্তানদের উন্নত মানের স্কুলে পড়াশোনা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা।
৩. দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা: বারবার ভিসা নবায়নের ঝামেলা ছাড়াই ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত থাকার অনুমতি।
৪. ব্যবসায়িক সংযোগ: সরাসরি চীনের সাপ্লাই চেইন ও কারখানার সাথে যুক্ত হওয়ার সুবিধা।
আবেদন প্রক্রিয়া ও অনুমোদনের সময়
চীনের রেসিডেন্ট পারমিট পাওয়ার প্রধান ধাপ হলো একটি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করা। প্রথমে কোম্পানির নাম প্রস্তাব করতে হয়। এরপর ব্যবসার ধরন অনুযায়ী বিজনেস লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। লাইসেন্স পাওয়ার পর স্থানীয় পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরো (PSB) থেকে রেসিডেন্ট পারমিটের জন্য আবেদন করতে হয়। সাধারণত পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে এবং হাতে পারমিট পেতে ৬০ দিন সময় লাগে।
गुয়াংঝুভিত্তিক ইজি লিংক ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শেখ কোরবান আলী বলেন, “২০২৬ সালে চীনের বিজনেস ইকোসিস্টেম এখন পুরোপুরি ডিজিটাল। এখন আর আপনাকে লাইনে দাঁড়িয়ে লাইসেন্স নিতে হয় না। আমরা ইজি লিংকের মাধ্যমে দেখেছি, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা যদি প্রপার বিজনেস প্ল্যান নিয়ে আসেন, তবে তাদের রিজেকশন রেট শূন্যের কাছাকাছি। বর্তমানের নতুন কোম্পানি আইনে ৫ বছরের ক্যাপিটাল পেমেন্ট সুবিধা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।”
বিনিয়োগের পরিমাণ ও খরচ
অনেকের ধারণা চীনে বিনিয়োগ করতে কোটি কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক প্রদেশে কোনো ন্যূনতম ‘পেইড-আপ ক্যাপিটাল’ বা বড় অংকের বিনিয়োগ দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত অফিস ভাড়া এবং লাইসেন্সিং ফি বাবদ খরচেই কোম্পানি চালু করা সম্ভব। তবে ব্যবসায়িক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন (যেমন ১ থেকে ৫ লাখ ইউয়ান) কাগজে-কলমে দেখানো ভালো, যা তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য চীনের রেসিডেন্ট পারমিটের সরকারি অনুমোদিত এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে গুয়াংঝুভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইজি লিংক ইন্টারন্যাশনাল।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দুই ধরনের বিশেষ প্যাকেজ অফার করছে:
১. ২৫ হাজার ইউয়ানের প্যাকেজ: যারা চীনে কোম্পানি না খুলে কেবল রেসিডেন্ট পারমিট বা বসবাসের আইনি বৈধতা পেতে চান, তাদের জন্য এই প্যাকেজ।
২. ৩৫ হাজার ইউয়ানের প্যাকেজ: যারা পূর্ণাঙ্গ কোম্পানি নিবন্ধনসহ রেসিডেন্ট পারমিট নিতে চান।
ইজি লিংক ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা মাহফুজ মোল্লা বলেন, “অনেকেরই ভুল ধারণা আছে যে চীনে থাকতে হলে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আমরা সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছি। একজন উদ্যোক্তা চাইলে আমাদের ২৫ হাজার ইউয়ানের প্যাকেজ গ্রহণ করে আইনিভাবে চীনে বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন। এটি বিশেষ করে তাদের জন্য উপযোগী যারা শুরুতে বড় অফিস বা কোম্পানি সেটআপের খরচ এড়াতে চান।”
কর্মী নিয়োগ ও পরিবারের সুযোগ
একজন উদ্যোক্তা তার কোম্পানিতে স্থানীয় চীনা নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশি কর্মীও নিয়োগ দিতে পারেন। এ বিষয়ে মাহফুজ মোল্লা আরও যোগ করেন, “চীনের আইন অনুযায়ী, একটি কোম্পানি (WFOE) তার ব্যবসায়িক পরিধি ও প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় চীনা নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশি কর্মীও নিয়োগ দিতে পারে। এখানে কোনো কঠোর উর্ধ্বসীমা নেই, তবে কোম্পানির টার্নওভার ও ট্যাক্স পেমেন্টের ওপর ভিত্তি করে কর্মী সংখ্যা নির্ধারণ করা যৌক্তিক। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোম্পানির মালিক এবং নিয়োগকৃত বিদেশি কর্মীরা তাদের পরিবারকে (স্ত্রী/স্বামী এবং সন্তান) চীনে নিয়ে আসতে পারেন। তাদের জন্য রয়েছে ডিপেন্ডেন্ট ভিসা, যা পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদে চীনে বসবাস ও সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ও আইনি দিক
বিদেশি কোম্পানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নীতিমালা রয়েছে। তবে চীনের এই প্রক্রিয়ায় শুরুতে বিশাল অংকের মূলধন পাঠানোর প্রয়োজন হয় না বিধায় অনেক উদ্যোক্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আইনি পথেই এগোচ্ছেন। সার্ভিস চার্জ বা পরামর্শ ফি পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রেফেল কনসালটেন্সি ও প্যাকেজ সুবিধা
বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ করছে ট্রেফেল কনসালটেন্সি ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৩৫ হাজার ইউয়ানের একটি সাশ্রয়ী প্যাকেজ দিচ্ছে, যার মধ্যে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে রেসিডেন্ট পারমিট পর্যন্ত সব সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট আসিফুল হাসনাত সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা শুধু লাইসেন্স করে দিয়েই ক্ষান্ত হই না, বরং একজন উদ্যোক্তা যাতে চীনে গিয়ে আবাসন ও ব্যাংকিং জটিলতায় না পড়েন, তাও নিশ্চিত করি। ৩৫ হাজার ইউয়ানের এই প্যাকেজটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্ববাজারে প্রবেশের একটি গেটওয়ে।”
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের আগ্রহ
দেশের সিংহভাগ আমদানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রিত হয় চট্টগ্রাম থেকে। ফলে চীনের এই রেসিডেন্ট পারমিটের সুযোগটি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা তৈরি পোশাকের এক্সেসরিজ, ইলেকট্রনিক্স এবং হার্ডওয়্যার পণ্য আমদানি করেন, তাদের জন্য এটি একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের টেরিবাজারের স্বনামধন্য কাপড় আমদানিকারক মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, “আমাদের ব্যবসার প্রয়োজনে বছরে অন্তত চার থেকে পাঁচবার চীনে যেতে হয়। প্রতিবার ভিসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সেখানে গিয়ে দোভাষী বা এজেন্টের ওপর নির্ভর করা অনেক ব্যয়বহুল। যদি মাত্র ৩৫ হাজার ইউয়ানের বিনিময়ে সেখানে নিজস্ব কোম্পানি এবং থাকার অনুমতি পাওয়া যায়, তবে সেটি আমাদের মতো আমদানিকারকদের জন্য আশীর্বাদ। এতে আমরা সরাসরি ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য যাচাই করার সুযোগ পাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন বেঁচে যাবে। চট্টগ্রামের অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন যৌথভাবে চীনে অফিস নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।”
চস/স


