ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায় ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ এবং মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও নির্বাচন অফিসের আয়োজনে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারিত) অনুষ্ঠিত এসব সভায় ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সততা, নিরপেক্ষতা ও সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে আয়োজনটি করতে যাচ্ছি, সেটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, শুধু একটি চেয়ারের পরিবর্তন নয়। এটি হচ্ছে নতুন বাংলাদেশের একটি রূপরেখা। যে বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষত আছে, যেখানে ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আমাদের সন্তানদের রক্ত দিতে হয়, গুলি বহন করতে হয়, গুলিবিদ্ধ হতে হয়- সেই বাংলাদেশ মেরামতের একটি আয়োজন। এই আয়োজনে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের এই আয়োজনে পরাজিত হওয়ার সুযোগ নেই। এই দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য জয় আনতে হবে, নাগরিকের প্রত্যাশা পূরণের জন্য জয় আনতে হবে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য জয় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আপনাদের জন্য সব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। বাংলাদেশ আনসার বাহিনী থেকে শুরু করে র্যাব, বিজিবি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী- সব বাহিনীর ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ ডেপ্লয়মেন্ট করা হয়েছে। অতীতে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা যারা সরকারের কর্মচারী, আমাদের গায়ে কাদা লেগেছে। আমরা সেই কাদা দূর করতে চাই।
ডিসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা এমন একটি দেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আপনি, আমি, আমার সন্তান নিরাপদ। সেই দেশ তৈরির দায়িত্ব আপনাদের ওপর অর্পিত হয়েছে। দায়িত্ব শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর প্রতি শৈথিল্য বরদাস্ত করা হবে না। নির্বাচন কমিশন কোনো দায়সারা ভাব গ্রহণ করবে না। আমি নিজে যেমন মনিটরিংয়ের আওতায় আছি, তেমনি প্রত্যেককে প্রত্যেকটি সেকেন্ডে মনিটরিং করা হচ্ছে। সুতরাং যারা প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আপনারা রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা ও মায়া দেখান, ব্যক্তিগতভাবে নয়। দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, আপনাদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের সকল টিম প্রস্তুত। সেনাবাহিনী আশ্বস্ত করেছে—যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে ৩–৫ মিনিটের মধ্যে, সর্বোচ্চ ১৫ মিনিটের মধ্যে মোবাইল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে। কিন্তু ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, এই দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। এখানে কোনো ধরনের কার্পণ্য হলে আমরা তা মেনে নেব না।
জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, দলীয় ভোটের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—গণভোট। নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রে এসে গণভোট সম্পর্কিত নানা প্রশ্ন করবেন। আপনারা কখনো বলতে পারবেন না, ‘আমি জানি না’। আপনাদের বুঝিয়ে বলার মতো জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দায়িত্বের সঙ্গে ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতা আইন অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, এই আয়োজন যদি বাংলাদেশকে জেতাতে হয়, মানুষের স্বপ্ন ও দেশের সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হয় তাহলে একটাই পরিচয় প্রয়োজন, তা হলো নিরপেক্ষতা। সরকারি কর্মচারী হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো নিরপেক্ষ থাকা। আইন যে নির্দেশনা দেবে, সেটি মানতে হবে। সেই নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে যদি কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সেই চ্যালেঞ্জ আপনাকে নিতে হবে। আমরাও সেই চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি।
ডিসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা জাতিকে একটি উৎসবমুখর, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে মাঠে নেমেছি। সেই চ্যালেঞ্জ আপনাকেও নিতে হবে। আমি চাই না আমাদের মেধাবী সন্তানরা দেশের বাইরে চলে যাক। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে কেউ বিবেক বিক্রি করবে না, কেউ কারো গোলাম হবে না। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যাই ঘটুক, সবকিছু মনিটরিংয়ের আওতায় থাকবে। কেউ দায়মুক্তি পাবে না।
তিনি যোগ করে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আপনাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা আছে। দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের মানুষ যে নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করেছে, যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চেয়েছে সে যেন নিরাপদে ভোট দিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফিরে যায়। সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
সভায় বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান, মেজর মো. আসিফুর রহমান,স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মঈনউদ্দিন হাসান, আনসার ও ভিডিপির সহকারী পরিচালক ফরিদা পারভিন এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চস/স