বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইয়ে দিয়ে সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে প্রবাসী আয়ে সর্বকালের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ মাসে প্রবাসীরা মোট ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি) মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন।
মূলত পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁদের পরিবার-পরিজনের কাছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অর্থ পাঠানোয় রেমিট্যান্সের এই জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও পরোক্ষভাবে এই প্রবাহ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের মার্চ মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় এ বছরের মার্চে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। শুধু তাই নয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশে মোট ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি।
ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার, যা এক মাসের ব্যবধানে উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে মার্চে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তবে বর্তমান এই উল্লম্ফন সত্ত্বেও আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্সের গতিধারা নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনেও এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভিবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে আগামীতে অর্থ পাঠানোর গতি কিছুটা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং এক-তৃতীয়াংশ সারের চালান পরিবহন করা হয়। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রণালিতে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সারের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে।
এর ফলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সব মিলিয়ে মার্চ মাসে রেকর্ড আয় এলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিবেশ আগামীতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চস/স


