spot_img

৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার
১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সর্বশেষ

রক্তস্বল্পতা ও নিরাপদ মাতৃত্ব

নিরাপদ মাতৃত্ব সুখি পরিবার ও সুন্দর সমাজের জন্য অন্যতম একটি আকাংখিত বিষয়। মাতৃসেবায় আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে গিয়েছে যা আজ বিশ্বদরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। কিন্তু এখনো বেশ কিছু ব্যাপারে দুঃখজনক অসচেতনতা আমাদের মধ্যে দেখা যায়। গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতা তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কখনো কখনো অবহেলিত একটি সমস্যা। এখনকার যুগে নানা কারণে বাচ্চা জন্ম নেওয়ার সময় বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে সম্মানিু চিকিৎসকগণ এক ধরনের যুদ্ধে রত থাকেন। এ যুদ্ধ দুটি জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ। কারণ গর্ভকালীন যে কোন সমস্যা কেবল মা নয়, তার গর্ভের শিশুরও নানা ক্ষতি করতে পারে। তাই গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতারর মত তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
অনেক মা গর্ভধারণের আগে থেকেই রক্তস্বল্পতায় ভোগেন, কিন্তু তারা এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন না। কম খাবার বা খাবারে যথাযথ পুষ্টির অভাবে রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়া হতে পারে। মাসিকে অধিক রক্তপাতের জন্য রক্তস্বল্পতা হতে পারে। হরমোনের সমস্যা, অটো ইমিউন/জয়েন্টের রোগ (ঝখঊ, জঅ), পেপ্টিক আলসার বা নিজে নিজে দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিক এর ওষুধ বা ব্যথার ওষুধ খাওয়া হতে পারে রক্তস্বল্পতার কারণ। পাইলস্‌ বা হ্যামোরয়েড থাকলে রক্তশূন্যতা হতে পারে। অনেকেই থ্যালাসেমিয়া জাতীয় বংশগণ রক্তরোগে ভোগেন যা গর্ভকালীন সময়ে এসে ধরা পড়ে। অথচ এই থ্যালাসেমিয়া মা অথবা বাবা থেকে বাচ্চাকে আক্রান্ত করতে পারে। এটা ঠেকানোর জন্যই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর রক্তপরীক্ষা করতে বলা হয়।
গর্ভকালীন সময়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বাচ্চার অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই মায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। তবে উপরের কারণগুলো বা অন্যকোন জটিল কারণও সাথে থাকতে পারে। অনেক সময় গর্ভকালীন অস্বাভাবিক বমির কারণে খেতে না পারাকেও রক্তস্বল্পতার জন্য দায়ী করা হয়। মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত না থাকলে মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার কাছে যথাযথ পুষ্টি পৌছায়না। ফলে বাচ্চার নানা ক্ষতি হতে পারে। যেমন, ওজন কম হওয়া, বিকলাংগণা ইণ্যাদি। আবার মায়েরও সমস্যা হয় যেমন, অকাল গর্ভপাত, প্রসবের রাস্তায় রক্তপাত, খিচুনি, হার্ট ফেল ইত্যাদি।
ক্লান্তি, অধিক দুর্বলতা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট বা বুকে চাপ চাপ লাগা, মাথা ঘোরানো, বুক ধুপ ধুপ করা ইত্যাদি রক্তস্বল্পতার সাধারণ লক্ষণ। এসব লক্ষণ না থাকলেও গর্ভকালীন সময়ে সম্মানিত চিকিৎসকগণের পরামর্শে নিয়মিত রক্তস্বল্পতার পরীক্ষা করা খুব জরুরি।
রক্তস্বল্পতার জন্য অনেক সময় মাকে নিয়মিত আয়রন ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটি অনেকক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হয়না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঔষধের ডোজ বাড়ালেও ওষুধ পাকস্থলী থেকে রক্তে পৌছায় না। উল্টো পেটের নানান সমস্যা সৃষ্টি হয়। তখন প্রয়োজনে অন্যভাবে ওষুধ নিতে হয়। তবে যে কোন ওষুধ নেওয়ার আগেই রক্তস্বল্পতার কারণ নির্ণয় এর জন্য সম্মানিু বিশেষজ্ঞগণের মতামত গ্রহণ ও পরীক্ষানিরীক্ষা বাধ্যতামূলক। কারণ আয়রন কমাই রক্তস্বল্পতার একমাত্র কারণ নয়। আবার গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট মাস ভেদে বা অন্যান্য কারণে ভিন্ন ভিন্ন আসতে পারে। পরীক্ষার আগেই ওষুধ নিয়ে ফেললেও পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আবার সব পরীক্ষাও এ সময় করা যায় না। অনেকেই নিজে নিজে পরীক্ষা করেন। তাই এই ধরনের বিপদ ঠেকাতে সঠিকভাবে সম্মানিু বিশেষজ্ঞগণের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। সম্মানিত চিকিৎসকগণ যাঁরা নিয়মিত রোগীকে দেখছেন তাঁরা এসব ক্ষেত্রে রোগীকে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করতে পারেন। উন্নত বিশ্বে রক্তস্বল্পতা বা যে কোন কমপ্লিকেশনে নির্দিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ রোগীর চিকিৎসা দেন যা অনেক জটিলতা রোধ করে রোগীকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করে।
অনেকেই রক্ত কম পেলেই রক্ত দিয়ে দেন। এটি প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞগণ এটি একেবারেই সমর্থন করেন না। বেশিরভাগ রক্তস্বল্পতায় কারণ নির্ণয় করে ওষুধ দিয়ে ভাল করা যায়। রক্তসঞ্চালন শরীরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এতে মা এবং বাচ্চা উভয়ের নাননা ক্ষতি, এমনকি জীবন সংশয় হতে পারে। আয়রন ওষুধও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া করতে পারে। গর্ভকালীন যে কোন ওষুধ নেয়ার বা না নেয়ার আলাদা নিয়ম আছে। সাধারণ মানুষের পরামর্শে বা নিজে নিজে ওষুধ গর্ভাবস্থায় বা অন্য যে কোন সময় প্রাণঘাতি হতে পারে। মা ও বাচ্চার নানা ধরনের বিপদ হতে পারে। সুস্থ মা থেকেই সুস্থ সন্তান আশা করা যায়। সুস্থতা আল্লাহর এক অপার অনুগ্রহ। তাই আসুন একটি সুস্থ সুখি সমাজ বিনির্মাণ এর জন্য মায়েদের এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার সঠিক চিকিৎসার ব্যাপারে সচেতন হই। সুস্থ সন্তান ও সুস্থ মা পরিবারকে সুখি করে। তখন সমাজটাও আপনা আপনি সুন্দর হয়ে যায়। চলুন আপনার আমার আশেপাশেই অনেকে এই কথাগুলো জানেন না তাঁদের জানাই। সবাই মিলে ভাল থাকার চেষ্টা করি।

Latest Posts

spot_imgspot_img

Don't Miss