হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়ানোর পরিবর্তে খাদ্য উৎপাদন থেকে প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশন—প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় চট্টগ্রাম থেকে এ ধরনের একটি নতুন অভিযাত্রা শুরু হতে পারে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামে রেস্তোরাঁয় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক র্যালি শেষে জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন। এ সময় রেস্তোরাঁগুলোর রান্নাঘর, খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনব্যবস্থা, সংরক্ষণ এবং পরিচ্ছন্নতায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা জানান তিনি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চিন্তা করতে হবে—আমরা কি হাসপাতালের লাইন আরও দীর্ঘ করব, নাকি মানুষকে অসুস্থ হওয়ার আগেই সুস্থ রাখার চেষ্টা করব?’
দেশে হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা বাড়লেও রোগীর চাপ কমছে না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ১০ বছর আগে হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ কেমন ছিল এবং এখন কেমন, তা দেখতে হবে। হাসপাতাল বাড়লেও অনেক জায়গায় রোগীরা শয্যা পাচ্ছেন না। কেন এমন হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
তাঁর মতে, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আর রোগ প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা যদি স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ না করি, তাহলে সুস্থ জাতি গঠন করতে পারব না।’
খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, পশু-পাখি পালনে ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ এবং খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনে স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি—বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্য অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
তাই উৎপাদন থেকে ভোক্তার খাবারের টেবিলে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বাইরে তৈরি খাবারের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। কর্মজীবী অনেক পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন ঘরে রান্না করা সম্ভব হয় না। অনলাইনে খাবার অর্ডার এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। এ কারণে রেস্তোরাঁয় নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
খাদ্যে অনিয়ম ঠেকাতে বছরের পর বছর অভিযান ও জরিমানা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি বলে জানান জেলা প্রশাসক। জরিমানার পরও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের অনিয়ম আবার দেখা যাচ্ছে।
এ কারণে শুধু জরিমানা ও শাস্তির ওপর নির্ভর না করে রেস্তোরাঁ মালিক ও কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
‘শুধু জরিমানা করাই আমাদের দায়িত্ব নয়। যাঁরা ব্যবসা করছেন, তাঁদেরও দায়িত্ব নিতে হবে,’ বলেন জাহিদুল ইসলাম।
রেস্তোরাঁয় কর্মরত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে প্রাথমিক তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক। বিশেষ করে রান্না, খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। কর্মীদের মাধ্যমে কোনো সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের কথাও বলেন তিনি।
প্রতিটি রেস্তোরাঁকে নিবন্ধিত শ্রেণি অনুযায়ী নির্ধারিত মান বজায় রাখতে হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান যে মানের রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, ভোক্তার সেই মানের নিরাপদ খাবার ও সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
নির্ধারিত মান বজায় রাখতে না পারলে রেস্তোরাঁর গ্রেড পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। বিষয়টি ভোক্তাদের জানানোর ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ এবং ‘দেশব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান–২০২৬’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে একটি সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। কাজীর দেউরি হয়ে র্যালিটি স্টেডিয়াম মার্কেট প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
পরে স্টেডিয়াম এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। একই সময়ে জেলার অন্যান্য রেস্তোরাঁয়ও মালিক ও কর্মীরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালান। এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংসও এ কার্যক্রমের অংশ ছিল।
জেলা প্রশাসক বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত চট্টগ্রাম গড়তে গত জুলাই থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। এর ধারাবাহিকতায় রেস্তোরাঁয় পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান রেস্তোরাঁয় রান্না ও খাবার পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যসনদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির প্রতিনিধিরাও নিরাপদ খাবার পরিবেশনে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কথা জানান।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ মালিক, কর্মী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তা—সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছে উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম পথ দেখাতে পারে।
চস/স

