spot_img

৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার
১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সর্বশেষ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে যা আছে

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে (এআরটি) সই করেছে বাংলাদেশ। এতে দেশীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির বিস্তারিত জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭ বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট্র Reciprocal Tariff (RT) আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ আলোচনার মধ্যমে ওই শুদ্ধ প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ জানান। পরে যুক্তরাষ্ট্র RT আরোপের পর একটি অভিন্ন RT চুক্তির খসড়া প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশকে প্রেরণ করে। যেসব দেশ ওই চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ওই বছরের ৩০ আগস্ট একটি Revised RT হার নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয়।

বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের পর Agreement on Reciprocal Trade (ART) চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেয়। সেই সঙ্গে এই কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, RT চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই WTO TRIPS চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের RT চুক্তিতে নতুন কোনো শর্ত আরোপিত হয়নি। এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ আগেই ILO, TRIPS ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। RT-তে ওই চুক্তির বিধানাবলী বাস্তবায়নে সম্মতি দেয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও জানায়, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস থেকে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায়, সেই বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে, এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে চুক্তিতে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরি করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য RT হারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। আর এ ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।

চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য

১. এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে Reciprocal Tariff চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সঙ্গে Joint Declaration সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষর অপেক্ষমাণ। যেসব চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Agreement on BD-US Reciprocal Trade এর কিছু মিল রয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।

যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ওই দু’টি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদের ওই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত ART এর খসড়াতে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।

২. Rules of origin এর text এর মধ্যে Foreign বা Domestic Value Addition এর পরিমাণ নির্ধারিত নেই। ফলে text অনুযায়ী পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।

৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং man-made fiber textile inputs ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য ওই দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমনটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত Agreement on Reciprocal Trade (ART)-তে উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

৪. এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা (Market access) প্রদানের ৭১৩২টি tariff line/HS Code কে offer list এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে offer list এর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:

(ক) ৪৯২২টি tariff line কে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি tariff line এর শুল্কহার ইতোমধ্যে শূন্য রয়েছে)।

(খ) ১৫৩৮টি tariff line এর শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।

(গ) ৬৭২টি tariff line এর শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।

(ঘ) ৩২৬টি tariff line কে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত CEPA’র offer list এর ৮১টি EMFN tariff line কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।

উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত ART’তে ধাপে ধাপে শুদ্ধ হ্রাসের (staging) বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ART’তে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।

৫. ART paperless trade বাস্তবায়ন, IPR enforcement, E-commerce permanent moratorium কে সমর্থন, Non-Tariff Barrier TBT হাস, Trade Facilitation, Conformity Assessment Certificate, Good Governance nuclear reactors, fuel rods, or enriched uranium ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি IPR সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি accession প্রস্তাবে সম্মতি দেয়া হয়েছে।

৬. ART তে ই-কমার্স এ permanent moratorium-কে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে ওই দেশের FDA’র সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথোরাইজেশনের পূর্বানুমতি ব্যতীত আমদানির সুযোগ; FMVSS-কে স্বীকৃতি; রিম্যানুফেকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা; খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের SPS মেজার্সকে স্বীকৃতি প্রদান; ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহ উল্লেখ রয়েছে।

পাশাপাশি এগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলোজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (Non- Living Modified Organisms না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি; জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং MRL কে স্বীকৃতি; Plant and Plant products এর আমদানিতে market access প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন; ইনস্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, এন্টিকরাপশন সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও এর এগ্রিমেন্ট অন ফিসারিজ সাবসিডিকে accept করা ও Illegal Unreported and Underregulated (IUU) এর ক্ষেত্রে সাবসিডি প্রদান না করা, পরিবেশ রক্ষায় এ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজ সম্পদ ও Wildlife এর অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ; আন্তর্জাতিক Labor সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের labor law কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলোজিতে CBPR, PRP, PDPO ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ওই দেশ থেকে বোয়িং ক্রয়, LNG, LPG, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

৮. কোনো দেশের পক্ষেই চুক্তি terminate করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে exit clause অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার Agreement on BD-US Reciprocal Trade মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে competitiveness ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে বলেও আশা করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

চস/স

Latest Posts

spot_imgspot_img

Don't Miss