চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ‘ছিন্নমূল জনপদ’ নামে পরিচিত এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে কুখ্যাত।
গতকাল সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে সেখানেই র্যাব–৭–এর প্রতিনিধিত্বকারী বিজিবির নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেবকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার সঙ্গে থাকা র্যাবের আরো দুই সদস্য এবং একজন সোর্সকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তিনজনকেই গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে।
র্যাব–৭–এর দুই কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবস্থান আরো শক্ত হয়। এখান থেকেই তারা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ড ও হামলা পরিচালনা করে আবার জঙ্গল সলিমপুরেই ফিরে যায়। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় দুই মাস আগেই এলাকায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার দিন সকালে র্যাবের একটি সোর্স খবর দেয় যে জঙ্গল সলিমপুরে একটি দলের কার্যালয় উদ্বোধন হবে, যেখানে চট্টগ্রামের আলোচিত তিন সন্ত্রাসী উপস্থিত থাকবেন। তাদের মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইয়াছিনও রয়েছেন বলে তথ্য আসে। দুপুর থেকেই র্যাব প্রস্তুতি শুরু করে। দুটি মাইক্রোবাস ও একাধিক সিএনজি অটোরিকশায় ১৬ সদস্যের দল বেলা ৩টায় অভিযানে নামে।
বেলা সাড়ে ৩টার দিকে র্যাবের চার সদস্য—যার মধ্যে ছিলেন নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব—ওই দলের কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন ভেতরে অন্তত ১৫০ নেতাকর্মী অবস্থান করছিলেন। র্যাবের সদস্যরা ইয়াছিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পড়ালে র্যাবের চার সদস্যকে ঘিরে ধরে প্রথমে ধাক্কাধাক্কি, তারপর শুরু হয় বেধড়ক পিটুনি। কার্যালয়ের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রায় ৩০০ জন হামলাকারী র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল ছোড়ে।
র্যাবের পাঁচ সদস্য জানান, ভেতরে আটক সঙ্গীদের বাঁচাতে বাইরে থাকা র্যাব সদস্যরা এগোতে চাইলে হামলাকারীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আরো লোক জড়ো করে। ভাঙচুর করা হয় র্যাবের মাইক্রোবাস। হামলার তীব্রতা দেখে র্যাব সদস্যরা নিরুপায় হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।
র্যাব–৭–এর একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির কার্যালয়ের ভেতরে থাকা র্যাব সদস্যদের শুধু মারধরই নয়, বরং অপহরণের মতো করে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আবারও তাদের ওপর হামলা হয়। সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন নায়েব সুবেদার আব্দুল মোতালেব। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহিনুল ইসলাম জানান, ‘আমরা খবর পাই যে চার র্যাব সদস্যকে আটকে রাখা হয়েছে। র্যাবের কাছে দিতে তারা অস্বীকৃতি জানায়। পরে আমি নিজে টিম নিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে নিজামপুর থেকে তাদের উদ্ধার করি। চারজনের শরীরেই গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। কারো শরীরে গুলির আঘাত পাইনি। যিনি মারা গেছেন, তার শরীরেও গুলির চিহ্ন দেখিনি।
র্যাব–৭-এর গণমাধ্যম শাখার সিনিয়র সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ আসামি গ্রেপ্তারে সলিমপুরে অপারেশনের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় একজন নিহত হন। আহত তিনজন এখন স্থিতিশীল। নিহত আব্দুল মোতালেবের বাড়ি কুমিল্লার কোটবাজারে। জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। হামলাকারীদের শনাক্তে আমরা কাজ করছি।’ সূত্র: আমার দেশ
চস/স


